তারাপীঠ কি সতীর ৫১ পীতের একটি? পুরাণ ও শাস্ত্রের আসল সত্য জানলে চমকে উঠবেন!

পশ্চিমবঙ্গের সবচেয়ে জাগ্রত ও অলৌকিক তীর্থক্ষেত্রগুলির অন্যতম হলো বীরভূমের তারাপীঠ। সারা বছর ধরে মা তারার অলৌকিক কৃপা ও দর্শনের আশায় দেশের কোণায় কোণায় ছড়িয়ে থাকা লক্ষ লক্ষ ভক্ত এখানে ছুটে আসেন। সাধারণ পুণ্যার্থীদের মধ্যে একটি বহুল প্রচলিত ধারণা রয়েছে যে, তারাপীঠ বুঝি সতীর ৫১ সতীপীঠের একটি। কিন্তু আসল শাস্ত্র ও পুরাণ কী বলছে? তারাপীঠ কি সত্যিই একটি শক্তিপীঠ, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে রয়েছে অন্য কোনো গভীর আধ্যাত্মিক ইতিহাস?
তারাপীঠ শক্তিপীঠ নয়, এটি একটি মহাসিদ্ধপীঠ
পৌরাণিক কাহিনী অনুযায়ী, দক্ষযজ্ঞে দেবী সতীর দেহত্যাগের পর মহাদেবের তাণ্ডব থামাতে ভগবান বিষ্ণুর সুদর্শন চক্রে সতীর দেহ ৫১টি খণ্ডে বিভক্ত হয়ে মর্ত্যের যেখানে যেখানে পড়েছিল, সেখানেই একটি করে শক্তিপীঠ গড়ে ওঠে। কিন্তু পৌরাণিক ও তান্ত্রিক শাস্ত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তারাপীঠে সতীর দেহের কোনো অংশই পতিত হয়নি।
অনেকে মনে করেন, এখানে দেবী সতীর চোখের মণি বা ‘তারা’ পড়েছিল। তবে তন্ত্রশাস্ত্রে এই দাবির কোনো শক্ত শাস্ত্রীয় প্রমাণ পাওয়া যায় না। শাস্ত্র অনুযায়ী, তারাপীঠের আসল মাহাত্ম্য লুকিয়ে রয়েছে এর অনন্য সাধনা ক্ষেত্রে। এটি মূলত সপ্তর্ষি বশিষ্ঠ মুনির প্রধান সাধনাপীঠ বা সিদ্ধপীঠ।
বশিষ্ঠ মুনি ও বামাক্ষ্যাপার সাধনার অলৌকিক ইতিহাস
কাহিনি অনুযায়ী, ব্রহ্মার মানসপুত্র ঋষি বশিষ্ঠ দশ মহাবিদ্যার দ্বিতীয় রূপ দেবী তারার (যিনি নীল সরস্বতী, বাকশক্তিপ্রদায়িনী, নীলবর্ণা ও চতুর্ভুজা) সাধনা শুরু করেছিলেন। কিন্তু ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে বহু বছর তপস্যা করেও তিনি দেবীর সিদ্ধিলাভ করতে পারেননি।
অবশেষে এক দৈববাণী পেয়ে তিনি তিব্বত বা চীনে যান এবং সেখানে বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যদের কাছ থেকে তান্ত্রিক ‘পঞ্চ-মকার’ সাধনার (মদ্য, মাংস, মৎস্য, মুদ্রা ও মৈথুন) গুপ্ত তত্ত্ব শিক্ষা করেন। এরপর ভারতে ফিরে এসে তারাপীঠ মহাশ্মশানের শ্বেত শিমুল গাছের নিচে পঞ্চমুণ্ডির আসনে বসে কঠোর বামাচারী সাধনা শুরু করেন তিনি। এই শ্মশানেই দেবী তারা তাঁকে প্রত্যক্ষ দর্শন দেন এবং ঋষি বশিষ্ঠ সিদ্ধি লাভ করেন।
পরবর্তীকালে একই মহাশ্মশানে পঞ্চমুণ্ডির আসনে সাধনা করে সিদ্ধিলাভ করেছিলেন পরম সাধক যুগাবতার বামাক্ষ্যাপা। তিনি মা তারাকে নিজের গর্ভধারিণী মা জ্ঞানে সেবা করতেন। পরবর্তীতে বীরভূমের মল্লারপুরের জমিদার জগন্নাথ রায় মা তারার বর্তমান মন্দিরটি নির্মাণ করে দেন।
“১ লক্ষ জপেই মা তারা প্রসন্ন হবেন!”
শাস্ত্র মতে, মা তারার প্রত্যক্ষ দর্শন পাওয়ার জন্য ঋষি বশিষ্ঠকে যুগ যুগ ধরে চরম কঠোর তপস্যা করতে হয়েছিল। বশিষ্ঠের সাধনায় সন্তুষ্ট হয়ে সিদ্ধিলাভের পর মা তারা তাঁকে বিশেষ বর দিয়ে আশীর্বাদ করেছিলেন। দেবী বলেছিলেন—
“আজকের পর থেকে আমার কোনো সাধককে তোর মতো এত কঠোর তপস্যা করতে হবে না। এই তারাপীঠ সিদ্ধপীঠে এসে যে কোনো সাধক এক লক্ষ বার তারা মন্ত্র জপ করলেই সিদ্ধিলাভ করতে পারবে।”
দেবী তারার এই পরম বরদানের কারণেই যুগে যুগে সাধক ও ভক্তরা মহা তান্ত্রিক সাধনার উদ্দেশ্যে তারাপীঠে ছুটে এসেছেন। তাই তারাপীঠ ভৌগোলিক বিচারে সতীর সতীপীঠ না হলেও, এটি সমগ্র বাংলার সবচেয়ে বড় এবং অলৌকিক তন্ত্রসাধনার মহাসিদ্ধপীঠ।