মাঠের ধারে সাপের ফণা তোলা ওই গর্ত আসলে কার? সত্যটা জানলে আপনিও চমকে যাবেন!

সাপের (Snake) গর্ত নিয়ে ছোটবেলা থেকেই আমাদের সমাজে নানা গল্প ও উপকথা প্রচলিত রয়েছে। গ্রামীণ মাঠে-ঘাটে বা ঝোপঝাড়ের ধারে গর্ত থেকে সাপকে ফণা তুলে বেরিয়ে আসতে দেখে আমরা অনেকেই ধরে নিই সেটি সাপের নিজের তৈরি বাড়ি। কিন্তু প্রাণীবিজ্ঞানের আশ্চর্যের বিষয় হল— বাস্তবে সাপ কখনোই নিজের গর্ত নিজে খুঁড়তে পারে না! মাটি খোঁড়ার মতো কোনো শারীরিক ক্ষমতাই সাপের নেই।

তাহলে প্রশ্ন ওঠে, মাঠের ধারে যে রহস্যময় গর্তগুলিতে সাপের উপস্থিতি দেখা যায়, সেগুলি আসলে তৈরি করে কে?

অন্যের কষ্ট করে বানানো বাড়িতে ‘বিনা ভাড়ায়’ বসবাস!
সত্যি বলতে, আমরা যেগুলিকে ‘সাপের গর্ত’ বলি, তার সিংহভাগই মূলত ইঁদুর, কাঠবিড়ালি বা অন্যান্য ছোট প্রাণীর তৈরি করা গর্ত। ইঁদুর অত্যন্ত পরিশ্রম করে মাটি খুঁড়ে নিজেদের থাকার জন্য নিরাপদ সুড়ঙ্গ বা বাড়ি তৈরি করে। আর সাপ অত্যন্ত নিঃশব্দে সেখানে ঢুকে পড়ে। সুযোগ বুঝে ইঁদুরটিকে নিজের শিকার বানায় এবং তারপর পুরো গর্তটির একচ্ছত্র দখল নিয়ে নেয়!

জীবনের কোনো পর্যায়েই বেশিরভাগ সাপের নিজস্ব তৈরি স্থায়ী কোনো বাড়ি থাকে না। বলা চলে, অন্যের কষ্ট করে বানানো বাড়িতে ‘বিনা ভাড়ায়’ স্থায়ী বা অস্থায়ী আস্তানা গাড়তেই এরা সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে।

ইঁদুরের গর্ত ছাড়া সাপের সবচেয়ে প্রিয় আস্তানা হল উইপোকা বা পিঁপড়ের মাটির ঢিবি। বিশেষ করে পরিত্যক্ত মাটির ঢিবি পেলেই এরা সেখানে আশ্রয় নেয়। কিন্তু কোনো রকম নোটিশ না দিয়ে অন্যের ঢিবি বা গর্তে সাপ কেন এভাবে ঢুকে পড়ে? প্রাণীবিজ্ঞানীদের মতে, এর পেছনে ৩টি প্রধান বৈজ্ঞানিক কারণ রয়েছে:

১. রেডিমেড খাবার ও শিকারের লোভ
সাপ কখনোই এক জায়গায় দীর্ঘদিন স্থায়ীভাবে বসবাস করে না। তাই কষ্ট করে বাড়ি বানানোর খাটনি তারা করতে চায় না। উইপোকা বা পিঁপড়ের মাটির ঢিবির আশপাশে ইঁদুর, ব্যাঙ, টিকটিকি ও ছোট ছোট পাখির আনাগোনা খুব বেশি থাকে। ফলে এসব ঢিবিতে ঢুকলেই সাপের জন্য একদম রেডিমেড খাবারের বন্দোবস্ত হয়ে যায়! এমনকি কিছু ছোট প্রজাতির সাপ সরাসরি পিঁপড়ের ডিম বা লার্ভা খাওয়ার লোভেই সেখানে আস্তানা গাড়ে।

২. প্রাকৃতিক ‘এসি’ ঘরের আরাম
সাপ মূলত শীতল রক্তের (Cold-blooded) প্রাণী। ফলে বাইরের পরিবেশের চরম গরম বা তীব্র ঠান্ডা এরা সহ্য করতে পারে না। কিন্তু উইপোকার মাটির ঢিবির ভেতরের তাপমাত্রা সারা বছরই খুব আরামদায়ক ও স্বাভাবিক থাকে। শীতে গরম আর গরমে আরাম— ঠিক যেন এক প্রাকৃতিক এসি (AC)-র সুবিধা পায় তারা। এমন শান্তির পরিবেশ ছেড়ে এরা তাই অন্য কোথাও যেতে চায় না।

৩. সুড়ঙ্গের জটিল নিরাপত্তা
পিঁপড়ে বা উইপোকার ঢিবির ভেতরের গঠন একদম গোলকধাঁধার মতো হয়। এতে অজস্র সরু ও জটিল সুড়ঙ্গ থাকে, যা সাপকে বাহ্যিক আক্রমণ থেকে দারুণ সুরক্ষা দেয়। বেজি, চিল বা বড় কোনো শিকারি পাখি চাইলেও এই আঁকাবাঁকা ও সরু গর্তের ভেতরে সহজে ঢুকতে পারে না। ফলে সাপ সেখানে নিশ্চিন্তে বিশ্রাম নিতে পারে। তবে সাধারণত পরিত্যক্ত ও ফাঁকা ঢিবিগুলিকেই এরা বেশি পছন্দ করে।

একমাত্র ব্যতিক্রম: রাজগোখরো বা কিং কোবরা
তবে সব সাপের স্বভাব কিন্তু একরকম নয়। যেমন ধরুন রাজগোখরো বা কিং কোবরা (King Cobra)। এরা কিন্তু অন্যের বাড়িতে বাস করা একদম পছন্দ করে না। ডিম পাড়ার প্রজনন মরশুম এলে কিং কোবরা শুকনো পাতা, ডালপালা ও মাটি একসঙ্গে জড়ো করে খুব সুন্দর ও মজবুত বাসা নিজেরা তৈরি করে নেয়। প্রাণীজগতে কিং কোবরাই একমাত্র সাপ, যারা ডিম রক্ষা করার জন্য নিজস্ব বাসা তৈরি করে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *