ফারুক-ওমরের গদিতে টানাটানি! ১৮ দলীয় বিধায়কের বিদ্রোহে জম্মু-কাশ্মীরে পতনঘণ্টা সরকারের?

২৭ অক্টোবরের মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণের পর থেকেই জম্মু ও কাশ্মীরের রাজনীতিতে বইছে তীব্র ঝোড়ো হাওয়া। ওমর আবদুল্লাহ সরকারের মন্ত্রিসভায় চারজন নতুন মন্ত্রী শপথ নেওয়ার পরপরই জম্মু অ্যান্ড কাশ্মীর ন্যাশনাল কনফারেন্স (NC)-এর অন্দরে ক্ষোভের আগ্নেয়গিরি বিস্ফোরণ ঘটেছে। নতুন চারজনকে অন্তর্ভুক্ত করার ফলে আইন অনুযায়ী ৯ জনের সর্বোচ্চ সীমার কোটা পূর্ণ হয়ে গিয়েছে। আর তাতেই দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষা করে থাকা একাধিক প্রবীণ ও সিনিয়র বিধায়কের মন্ত্রী হওয়ার আশায় জল ঢেলে দিয়েছে দলীয় নেতৃত্ব।

বহুপ্রবীণ তথা ছয়বারের জাঁদরেল বিধায়ক মুবারক গুল প্রকাশ্যে নিজের চরম ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন। তবে এই অসন্তোষ কেবল মন্ত্রিত্ব না পাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; বিদ্রোহী বিধায়কদের দাবি আরও চরম। তারা বর্তমান মন্ত্রিসভার আমূল পরিবর্তনের দাবি তুলেছেন। দুই বছর ধরে দায়িত্ব সামলানো একাধিক মন্ত্রীকে সরানোর পাশাপাশি মুখ্যমন্ত্রীর বিশেষ উপদেষ্টা নাসির আসলাম ওয়ানিকে অবিলম্বে বরখাস্ত করার এবং দলীয় সংগঠনে বড় ধরনের রদবদলের জোরালো দাবি উঠেছে।

শ্রীনগরে একের পর এক গোপন বৈঠক, ঘনীভূত চক্রান্ত!
বিদ্রোহের আঁচ ছড়িয়ে পড়েছে বিদ্যুৎ গতিতে। শ্রীনগরজুড়ে ইতোমধ্যেই চার দফায় রুদ্ধদ্বার বৈঠক সেরে ফেলেছেন অসন্তুষ্ট বিধায়করা। প্রথমে হুমহামায় বিধায়ক কায়সার লোনের বাসভবনে প্রাথমিক আলোচনা শুরু হয়। এরপর নাজির গুরেজি, ফারুক শাহ এবং সাবেক সংসদ সদস্য তথা বিধায়ক হাসনাইন মাসুদির বাড়িতে একের পর এক গোপন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।

দলীয় সূত্রের খবর, প্রায় ১৮ জন বিদ্রোহী বিধায়ক একজোট হয়ে গুপকার রোডে দলীয় সভাপতি ফারুক আবদুল্লাহ এবং মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহর বাসভবনে গিয়ে সরাসরি তাঁদের দাবি পেশ করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তবে মজার বিষয় হলো, সরকার সমর্থক যে নির্দল বিধায়করা এই সিদ্ধান্তের কারণে ক্ষুব্ধ, তাঁদের এই বৈঠকগুলির বাইরে রাখা হয়েছে। বিদ্রোহী বিধায়করা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, দাবিপূরণ না হলে তাঁরা সহজে পিছু হটবেন না। যদিও শীর্ষ নেতৃত্ব আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে, কিন্তু এই আলোচনা ব্যর্থ হলে গণইস্তফার পথ ধরতে পারেন বিদ্রোহীরা, যা ওমর সরকারের অস্তিত্বকে সরাসরি সংকটের মুখে ঠেলে দেবে।

বিধানসভার কঠিন সংখ্যার অঙ্ক:
৯০ আসন বিশিষ্ট জম্মু ও কাশ্মীর বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ৪৬টি আসন। বর্তমানে ওমর আবদুল্লাহর জোট সরকারের কাছে মোট ৫৪ জন বিধায়কের একটি আরামদায়ক ও নিরাপদ সমর্থন রয়েছে:

ন্যাশনাল কনফারেন্স (NC): ৪১

কংগ্রেস (Congress): ৬

নির্দল (Independents): ৬

সিপিআই(এম) [CPI(M)]: ১

অন্যদিকে বিরোধী শিবিরে রয়েছে ২৯ জন বিজেপি (BJP), ৪ জন পিডিপি (PDP), ১ জন পিপলস কনফারেন্স, ১ জন আম আদমি পার্টি (AAP) এবং ১ জন নির্দল বিধায়ক। খাতায়-কলমে সংখ্যার পাল্লা শাসক জোটের দিকে ভারী থাকলেও, এই সংঘবদ্ধ বিদ্রোহ এক লহমায় পুরো সমীকরণ উল্টে দিতে পারে।

ইস্তফা ও দলত্যাগ বিরোধী আইনের ফাঁদ:
যদি অসন্তুষ্ট ২০ জন বিধায়ক শেষ পর্যন্ত ইস্তফা দেন এবং স্পিকার তা গ্রহণ করেন, তবে বিধানসভার কার্যকরী আসন সংখ্যা কমে দাঁড়াবে ৭০-এ। সেক্ষেত্রে সরকার টিকিয়ে রাখার ‘ম্যাজিক ফিগার’ বা সংখ্যাগরিষ্ঠতার নতুন সীমা নেমে আসবে ৩৬-এ।

এই পরিস্থিতিতে শাসক জোটের মোট আসন সংখ্যা কমে দাঁড়াবে মাত্র ৩৪-এ (ন্যাশানাল কনফারেন্সের ২১, কংগ্রেসের ৬, নির্দল ৬ এবং সিপিআই-এম-এর ১)। অর্থাৎ, গদি বাঁচাতে প্রয়োজনীয় ৩৬টি আসনের থেকে ঠিক ২টি আসন পিছিয়ে পড়বে ওমর আবদুল্লাহর সরকার! তখন মাত্র একজন নির্দল বিধায়ক সমর্থন প্রত্যাহার করে নিলেই সরকার নিশ্চিতভাবে সংখ্যালঘু হয়ে পড়বে এবং পতন ঘটবে।

তবে নতুন দল গঠন বা অন্য দলে মেশার পথটি সংবিধানে বেশ জটিল। ২০১৯ সালের ‘জম্মু ও কাশ্মীর পুনর্গঠন আইন’-এর ২৮ নম্বর ধারা অনুযায়ী সংবিধানের দশম তফসিল বা দলত্যাগ বিরোধী আইন পূর্ণ মাত্রায় প্রযোজ্য। কোনো বিধানসভা দলকে ভেঙে অন্য দলে মিশতে হলে অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ (২/৩) বিধায়কের সম্মতি বাধ্যতামূলক—যা ন্যাশনাল কনফারেন্সের ৪১ জন বিধায়কের হিসাব অনুযায়ী ২৮ জন। সুতরাং, ২০ জন বিধায়কের একটি অংশ আলাদা হয়ে গেলে সরাসরি বিধায়ক পদ হারানোর ঝুঁকিতে পড়বেন।

আগামী কয়েক দিনে ফারুক আবদুল্লাহ ও ওমর আবদুল্লাহ তাঁদের রাজনৈতিক কূটনীতি দিয়ে জোট ও দলকে কীভাবে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ার হাত থেকে রক্ষা করেন, সেদিকেই নজর পুরো দেশের।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *