বানাতে খরচ ১ কোটি, খাঁটি ২৪ ক্যারেট সোনা! ‘রাক্ষসরাজ’ রাবণের সিংহাসন দেখে চোখ ছানাবড়া নেটপাড়ার

নীতেশ তিওয়ারির বহুপ্রতীক্ষিত মহাকাব্যিক সিনেমা ‘রামায়ণ’ মুক্তি পাওয়ার পর থেকেই বিশ্বজুড়ে অনুরাগী ও দর্শকদের মধ্যে তুমুল উন্মাদনা তৈরি হয়েছে। প্রায় ৪,০০০ কোটি টাকার বাজেট এবং নামিত মালহোত্রার প্রযোজনায় নির্মিত এই সিনেমাটি তার বিশাল ক্যানভাস, অবিশ্বাস্য ভিএফএক্স এবং সূক্ষ্ম নির্মাণের জন্য দর্শক মহলে ব্যাপক প্রশংসা কুড়োচ্ছে। তবে শুধুমাত্র তারকাদের অভিনয়ই নয়, এই সিনেমার বিশালতা ফুটে উঠেছে সেটের সূক্ষ্ম কারুকাজ এবং পোশাক-আশাকের রাজকীয়তায়।
সম্প্রতি জানা গেছে, সিনেমায় লঙ্কেশ্বর রাবণের রাজকীয় সিংহাসন এবং গয়না তৈরির নেপথ্যের কিছু চমকপ্রদ তথ্য, যা শুনে চোখ ছানাবড়া হওয়ার জোগাড় নেটিজেনদের।
৪ মাস সময় এবং ১ কোটি টাকার খরচ!
পর্দায় রামায়ণের এই মায়াবী রাজকীয় জগৎ তৈরি করা মোটেই সহজ কাজ ছিল না। আর্ট ডিরেক্টর রমেশ এক সাক্ষাৎকারে প্রকাশ করেছেন এই ঐতিহাসিক সেট নির্মাণের নেপথ্য গল্প। তিনি জানান, ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি এই প্রজেক্টে যুক্ত হন এবং মুম্বাইয়ের ফিল্ম সিটিতে প্রাইম ফোকাস স্টুডিওতে বিশাল সেট নির্মাণের কাজ শুরু হয়। সিনেমার জন্য ছোট-বড় মিলিয়ে ১৫০টিরও বেশি পৃথক সেট তৈরি করা হয়েছে।
আর্ট ডিরেক্টরের কথায়, “কোনো সেটই প্রথম চেষ্টায় চূড়ান্ত হয় না। আমরা যা পর্দায় দেখি, তার পেছনে অন্ততঃ ১০ থেকে ১৫টি আলাদা আলাদা নকশা বা ভ্যারিয়েশন বানাতে হয়। প্রায় তিন মাসের দীর্ঘ প্রস্তুতির পরেই মূল নির্মাণের কাজ শুরু করা সম্ভব হয়েছিল।”
সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হলো, রাবণের বিশালাকার ও মহিমান্বিত সিংহাসনটি কেবল ভিজ্যুয়াল ইফেক্টস (VFX)-এর সাহায্যে তৈরি করা হয়নি। শিল্পীরা প্রথমে মাটির একটি স্কেচ বা মডেল তৈরি করেন, তারপর সেটির একটি ছাঁচ বানানো হয়। ফাইবার দিয়ে মূল কাঠামোটি তৈরি করার পর তার ওপর করা হয় চরম নিখুঁত ফিনিশিং। সিংহাসনটিকে আসল লঙ্কার রাজকীয় রূপ দিতে এতে ব্যবহার করা হয়েছে আসল ২৪ ক্যারেট সোনার লিফিং (Gold Leafing)। এই অবিশ্বাস্য সিংহাসনটি সম্পূর্ণ তৈরি করতে সময় লেগেছে প্রায় ৪ মাস এবং এতে খরচ হয়েছে প্রায় ১ কোটি টাকা!
৬-৭ কেজি ওজনের অলঙ্কার ও খাঁটি সোনার ছোঁয়া
শুধু সিংহাসনই নয়, রাবণের চরিত্রটিকে পর্দায় অতিমানবীয় ও প্রভাবশালী করে তুলতে সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে তার পোশাক ও অলঙ্কারে। ‘হাউস অফ আম্রপালি’-র ক্রিয়েটিভ হেড তরঙ্গ অরোরা জানান, প্রাচীন বিশ্বাস অনুযায়ী লঙ্কা ছিল স্বর্ণপুরী। তাই লঙ্কেশ্বরের পোশাকে সেই অপরিসীম প্রাচুর্য ও আভিজাত্য ফুটিয়ে তোলা বাধ্যতামূলক ছিল।
তিনি বলেন, “রাবণের বুকের যে বিশাল চেইন বা চেস্ট প্লেটটি দেখা গেছে, সেটি আমাদের অভিজ্ঞ কারিগররা সম্পূর্ণ হাতে তৈরি করেছেন। তবে আমাদের বাস্তববাদীও হতে হয়েছে। আমরা একদিকে রাজকীয় প্রাচুর্য দেখাতে চেয়েছিলাম, আবার অন্যদিকে খেয়াল রাখতে হয়েছে অভিনেতা যেন একটানা ৬ ঘণ্টা এটি পরে স্বাচ্ছন্দ্যে শ্যুটিং করতে পারেন। সেজন্য গয়নাগুলোর ভেতরের দিকে নরম লাইনিং যোগ করা হয়েছিল যাতে তা শক্ত বা অস্বস্তিকর না লাগে।”
এছাড়াও, রাবণের পরম শিবভক্তির কথা মাথায় রেখে তার অলঙ্কারে বিশেষভাবে ব্যবহৃত হয়েছে সাপের নকশা (Snake motifs)।
১৩টি লুকে ১৩০টি বিশেষ গয়না!
সাধারণ প্রথাগত সোনালী রঙের পাশাপাশি ডিজাইনাররা রাবণের গয়নায় নীল, কালো এবং গাঢ় সবুজ রঙের শেড ও মেটালিক ফিনিশ ব্যবহার করেছেন, যা লঙ্কেশ্বরের ব্যক্তিত্বের সাথে মানানসই।
‘ট্রাইব আম্রপালি’-র পক্ষ থেকে রাবণ চরিত্রের জন্য মোট ১৩টি আলাদা লুকের গয়না ডিজাইন করা হয়েছিল। যার জন্য ১০৪ থেকে ১৩০টি পর্যন্ত বিশেষ অলঙ্কার তৈরি করা হয়। শ্যুটিংয়ের সময় অভিনেতা যে গয়নাগুলো গায়ে চাপাতেন, তার মোট ওজনই ছিল প্রায় ৬ থেকে ৭ কেজি!
প্রযোজনা সংস্থার এমন কঠোর পরিশ্রম এবং প্রতিটি খুঁটিনাটি বিষয়ে নিখুঁত নজর দেওয়াই আজ ‘রামায়ণ’-কে ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে।