ইলন মাস্কের ‘X’-এ দিল্লি পুলিশের নামে ভুয়া নোটিশ! হাইকোর্টে পর্দা ফাঁস হতেই শোরগোল

ইলন মাস্কের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘X’ (সাবেক টুইটার)-এ ভারতের দুই শীর্ষস্থানীয় ডিজিটাল রাইটস সংস্থার অ্যাকাউন্ট বন্ধের নোটিশ নিয়ে বড় তথ্য সামনে এসেছে। দিল্লি হাই কোর্টে এক্স কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ইন্টারনেট ফ্রিডম ফাউন্ডেশন (IFF) এবং সফটওয়্যার ফ্রিডম ল সেন্টার ইন্ডিয়া (SFLC.in)-এর অ্যাকাউন্ট ও পোস্ট সরাতে যে নোটিশ পাঠানো হয়েছিল, তা সম্পূর্ণ ভুয়া। পুলিশ সাজে অজ্ঞাতপরিচয় কোনো প্রতারক এই কাণ্ড ঘটিয়েছে।
শুক্রবার দিল্লি হাই কোর্টের বিচাপতি অমিত মহাজনের এজলাসে মামলার শুনানি চলাকালীন এক্সের আইনজীবী জানান, বিষয়টি নিয়ে প্ল্যাটফর্মটির অভ্যন্তরীণ তদন্ত করা হয়েছিল। তাতেই দেখা যায়, কোনো অফিশিয়াল মাধ্যম নয়, বরং দিল্লি পুলিশের পরিচয় নকল করে কোনো বহিরাগত এই রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছিল।
এক্স কর্তৃপক্ষের আইনজীবী আদালতে স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “এটা পুরোটাই একজন প্রতারকের কাজ। আমরা অভ্যন্তরীণ তদন্তের পর নিশ্চিত হয়েছি যে পুলিশ এই ধরনের কোনো নোটিশ দেয়নি। ইতিমধ্যেই আমরা ওই প্রতারকের বিরুদ্ধে দিল্লি পুলিশে লিখিত অভিযোগ জানিয়েছি।”
এক্স প্ল্যাটফর্ম আদালতের সামনে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, ওই দুই সংস্থার কোনো অ্যাকাউন্ট বা পোস্ট স্যাটানো হবে না। এরপর আদালত দুটি সংস্থার দায়ের করা আবেদনের নিষ্পত্তি ঘোষণা করে।
কী ঘটেছিল বাস্তবে এবং কীভাবে প্রকাশ্যে এলো এই জালিয়াতি?
ঘটনার সূত্রপাত গত ২৯ অক্টোবর। সেদিন আইএফএফ (IFF), এসএফএলসি (SFLC.in) এবং @geoblockedindia নামের অ্যাকাউন্টগুলিতে একটি আইনি নোটিশ পাঠানো হয়। নোটিশটিতে দাবি করা হয়, তারা রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ (RSS)-এর বিরুদ্ধে বিতর্কিত কনটেন্ট প্রকাশ করেছে এবং সেজন্য আরএসএসের পক্ষ থেকে আপত্তি জানানো হচ্ছে। সংস্থাগুলি শুরুতেই এই চিঠির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
এরপর ১ নভেম্বর এক্স প্ল্যাটফর্মের পক্ষ থেকে এসএফএলসি-কে জানানো হয় যে, একটি পোস্টের কারণে দিল্লি পুলিশের থেকে তাদের কাছে নোটিশ এসেছে। এর দু’দিন পর এক্স আরও কয়েকটি নোটিশ ওই সংস্থাগুলির কাছে পাঠায়, যাতে প্রায় এক ডজন ইউআরএল (URL), একাধিক পোস্ট এবং পুরো অ্যাকাউন্টটাই বন্ধ করে দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। সেখানে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS) এবং তথ্যপ্রযুক্তি আইনের নানা ধারা উল্লেখ করে আরএসএসকে মানহানি করার অভিযোগ তোলা হয়।
আইএফএফ এবং এসএফএলসি কী করে?
ইন্টারনেট ফ্রিডম ফাউন্ডেশন (IFF) এবং এসএফএলসি (SFLC.in) ভারতের নাগরিক সমাজের অত্যন্ত পরিচিত দুটি সংস্থা। তারা ইন্টারনেটের স্বাধীনতা, ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা (Privacy), ডিজিটাল অধিকার এবং অনলাইন সেন্সরশিপ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় সরকারের নানা নির্দেশ বা সেন্সরশিপ আইন মেনে করা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে নিয়মিত সমীক্ষা ও আইনি লড়াই চালায় তারা। যখন পুলিশের নামে পাঠানো নোটিশগুলির ইমেল আইডি দেখে তারা সন্দেহ করে যোগাযোগ করার চেষ্টা করে, দেখা যায় ইমেল ডেলিভারি ব্যর্থ হচ্ছে (Bounced back)। তখনই তারা এর আইনি বৈধতা নিয়ে চ্যালেঞ্জ জানাতে দিল্লি হাই কোর্টের দ্বারস্থ হয়।
এক্স কীভাবে জালিয়াতি পাকড়াও করল?
মামলা আদালতে গড়ালে এক্স তাদের অভ্যন্তরীণ সিকিউরিটি এবং রিপোর্ট হ্যান্ডলিং সিস্টেম খতিয়ে দেখে। সেখানেই ধরা পড়ে যে, অফিশিয়াল সিস্টেমের ফাঁক গলে কোনো বহিরাগত প্রতারক নিজেকে দিল্লি পুলিশ হিসেবে পরিচয় দিয়ে কনটেন্ট সরানোর আবেদন জমা দিয়েছিল। আপাতত দিল্লি পুলিশ তদন্ত করে বের করার চেষ্টা করছে কীভাবে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নাম ব্যবহার করে এমন সংবেদনশীল টেকডাউন রিকোয়েস্ট জমা দেওয়া সম্ভব হলো।
সাধারণ সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের জন্য এটি কেন উদ্বেগের?
এই ঘটনাটি সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলির রিপোর্ট যাচাইকরণ প্রক্রিয়ার (Verification Mechanism) এক বিরাট গলদ সামনে এনে দিয়েছে।
যদি কোনো সাধারণ প্রতারক অত্যন্ত সহজে কোনো বড় পুলিশ প্রশাসনের ছদ্মবেশ ধরে প্ল্যাটফর্মকে নোটিশ পাঠাতে পারে এবং কোনো অ্যাকাউন্ট বন্ধের দাবি জানাতে পারে, তবে যেকোনো বৈধ অ্যাকাউন্ট বা সাধারণ ব্যবহারকারী মিথ্যা আইনি ঝামেলার মুখে পড়তে পারেন। এই ঘটনার পর আইএফএফ ও এসএফএলসি-র পক্ষ থেকে এক্সের মতো সোশ্যাল মিডিয়া মাধ্যমে সরকারি বা আইনি রিপোর্ট নেওয়ার ব্যবস্থা আরও বেশি সুরক্ষিত ও কঠোর করার দাবি তোলা হয়েছে।