ট্রাম্পের হারের খেসারত মাস্কের? মার্কিন ভোটে রিপাবলিকানদের ধ্বসে ৪২০ বিলিয়ন ডলার গায়েব!

আমেরিকায় মিডটার্ম বা মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড়সড় রাজনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়লেন প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প। কার্যকালের মেয়াদ মাত্র দু’বছর বাকি থাকতেই মার্কিন কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়ে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে রিপাবলিকান পার্টি। উল্টোদিকে, হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভস এবং সেনেট— উভয় কক্ষেই আধিপত্য বিস্তার করেছে ডেমোক্র্যাটরা। তবে ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের পাশাপাশি এই ফলাফলের সরাসরি ধাক্কা এসে লেগেছে বিশ্বসেরা ধনকুবের ইলন মাস্ক এবং তাঁর সুবিশাল ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের ওপর।
নির্বাচনী ফলাফলের প্রভাব সরাসরি দেখা গেছে শেয়ার বাজারে। বৃহস্পতিবার বিকেলে মাস্কের ফ্ল্যাগশিপ সংস্থা SpaceX এবং Tesla-র শেয়ারের দর যথাক্রমে প্রায় ৯ শতাংশ এবং ১১ শতাংশ পর্যন্ত পড়ে যায়। নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের প্রত্যাবর্তনের পর মাস্কের সংস্থাগুলির ওপর মার্কিন কংগ্রেসের কঠোর নজরদারি এবং নতুন বিধিনিষেধ আরোপ হতে পারে— এই আশঙ্কায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক তৈরি হয়। মঙ্গলবারের বাজার বন্ধের পর থেকে বৃহস্পতিবারের মধ্যে SpaceX এবং Tesla-র সম্মিলিত বাজার মূলধন থেকে ৪২০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি হাওয়া হয়ে গিয়েছে।উল্লেখ্য, গত জুন মাসে SpaceX-এর প্রাথমিক শেয়ার বাজারে ছাড়ার (IPO) পর ইলন মাস্কের মোট সম্পদের পরিমাণ ১ লক্ষ কোটি (১ ট্রিলিয়ন) ডলারের ঐতিহাসিক গণ্ডি ছুঁয়েছিল। কিন্তু ফোর্বসের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত এক সপ্তাহেই প্রায় ৯০ বিলিয়ন ডলার খুইয়েছেন তিনি। যদিও বর্তমানে তাঁর মোট সম্পত্তি ৮০০ বিলিয়ন ডলারের কিছুটা নিচে নেমে এসেছে, তা সত্ত্বেও বিশ্বসেরা ধনীর তকমা এখনও তাঁর দখলেই রয়েছে।ফিনান্সিয়াল টাইমসের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির প্রচার ও প্রার্থীদের হয়ে মাস্ক একাই ৪৭০ মিলিয়ন (৪৭ কোটি) ডলারেরও বেশি আর্থিক অনুদান দিয়েছিলেন।
রিপাবলিকানদের জেতাতে টাকার পাহাড় ঢাললেও তাঁর সমর্থিত বেশিরভাগ প্রার্থীই এই নির্বাচনে হেরে গিয়েছেন।সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে টেক্সাসে, যেখানে Tesla এবং SpaceX-এর প্রধান কার্যালয় ও পরিকাঠামো অবস্থিত। সেখানে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জেমস টালারিকো এবং জিনা হিনোজোসা বিজয়ী হয়েছেন। তাঁরা পরাজিত করেছেন মাস্কের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ট দুই বর্ষীয়ান রিপাবলিকান নেতা— রাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেল কেন প্যাক্সটন এবং গভর্নর গ্রেগ অ্যাবটকে।ডয়েচে ব্যাঙ্কের (Deutsche Bank) প্রযুক্তি বিশ্লেষকরা এক নোটে সতর্ক করে জানিয়েছেন যে, টেক্সাসে ক্ষমতার রূপবদলের ফলে SpaceX এবং Tesla-র এআই (AI) এবং কম্পিউটিং পরিকাঠামো সম্প্রসারণের কাজ পিছিয়ে যেতে পারে। ডেমোক্র্যাট গভর্নর-ইলেক্ট জিনা হিনোজোসা আগেই ইঙ্গিত দিয়েছেন, ডেটা সেন্টারের বিদ্যুৎ খরচ, স্থানীয় পরিবেশ ও জলের সুরক্ষায় কঠোর নিয়ম তৈরি না হওয়া পর্যন্ত নতুন কোনো ডেটা সেন্টার বা ‘টেরাফ্যাব’ প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হবে না। এর ফলে সংস্থাকে আইনি শর্ত পূরণ করতে অতিরিক্ত বিপুল মূলধন খরচ করতে হতে পারে।পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে ইউক্রেন যুদ্ধ সংক্রান্ত বিতর্ক।
সিএনএন (CNN)-এর খবর অনুযায়ী, ইউক্রেনে ব্যবহৃত স্টারলিঙ্ক (Starlink) স্যাটেলাইট ইন্টারনেট পরিষেবা সম্পর্কিত تمام নথি সেনেটরদের কাছে জমা দেওয়ার নির্দেশ জারি করা হয়েছে মাস্ক এবং SpaceX-এর বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, এই পরিষেবার ওপর আরোপিত নির্দিষ্ট বিধিনিষেধের কারণেই একসময় রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউক্রেনের প্রতিরোধ ব্যাহত হয়েছিল।সব মিলিয়ে, একদিকে ডেমোক্র্যাটদের নেতৃত্বাধীন কঠোর নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারি, আর অন্যদিকে SpaceX ও Tesla-কে একীভূত (Merger) করার পরিকল্পনা আটকে যাওয়ার আশঙ্কায় রীতিমতো অস্বস্তিতে ধনকুবের ইলন মাস্ক। শেয়ার বাজারের এই বিপর্যয় ও রাজনৈতিক ক্ষমতার রদবদল টেক-দুনিয়ায় তাঁর একচ্ছত্র আধিপত্যকে বড়সড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিল।