‘এখানে নয়, স্টোর রুমে যান!’ ঘুষ নিতে গিয়ে এ কীভাবে ধরা পড়লেন বিদ্যুৎ দপ্তরের কর্তা?

‘এখানে নয়, স্টোর রুমে যান’। টেবিল থেকে মুখ না তুলে নিচু গলায় কথাগুলো বলেই নিজের ফাইলে চোখ রাখলেন বিদ্যুৎ দপ্তরের স্টেশন ম্যানেজার। তাঁর ঘর থেকে চুপচাপ বেরিয়ে এলেন নিউ ব্যারাকপুরের স্থানীয় প্রোমোটার অসীম সিকদার। সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে তিনি সরাসরি ঢুকে পড়লেন দপ্তরের অন্ধাকারাচ্ছন্ন স্টোররুমে। সেখানে যেন আগে থেকেই একজন তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিল। অসীমবাবু ঘরে ঢুকতেই সেই ব্যক্তি নিঃশব্দে হাতটা বাড়িয়ে দিল— ‘দিন টাকাটা।’

প্রথম কিস্তির ঘুষের টাকা নিজে হাতে ছুঁয়েও দেখেননি উত্তর ২৪ পরগনার নিউ ব্যারাকপুরের ‘পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিদ্যুৎ বণ্টন সংস্থা লিমিটেড’ (WBSEDCL)-এর অভিযুক্ত স্টেশন ম্যানেজার কৃষ্ণচন্দ্র দাস। প্রোমোটার অসীম সিকদারের দাবি, তাঁর নতুন আবাসন প্রকল্পে বিদ্যুৎ সংযোগ প্রদান এবং নতুন ট্রান্সফর্মার বসানোর জন্য সমস্ত সরকারি নিয়মকানুন মেনে আগেই প্রায় সাড়ে ৮ লক্ষ টাকা সরকারি তহবিলে জমা দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সমস্ত চালান দেখানো সত্ত্বেও সংযোগ দিতে অহেতুক টালবাহানা শুরু করেন স্টেশন ম্যানেজার কৃষ্ণচন্দ্র দাস। অভিযোগ, কাজটি দ্রুত মিটিয়ে দেওয়ার বিনিময়ে তিনি অতিরিক্ত বড় অঙ্কের ঘুষ দাবি করেন।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম কিস্তির দেড় লক্ষ টাকা অসীমবাবু জমা দিয়ে এসেছিলেন দপ্তরের স্টোররুমে থাকা ম্যানেজারের বিশ্বস্ত এজেন্টের কাছে। কিন্তু লোভের শেষ এখানেই ছিল না। কাজ সম্পূর্ণ করার নাম করে কিছুদিন পর কৃষ্ণচন্দ্রবাবু আরও ৩৫ হাজার টাকা ঘুষ দাবি করেন। বারবার সরকারি কর্মচারীদের এই কাটমানি ও তোলাবাজিতে অতিষ্ঠ হয়ে অবশেষে রাজ্য দুর্নীতি দমন শাখা (ACB)-র দ্বারস্থ হন প্রোমোটার। তাঁর লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে তড়িঘড়ি ফাঁদ পাতেন দুর্নীতি দমন শাখার দুখোড় আধিকারিকরা।

পরিকল্পনামতো অসীমবাবু স্টেশন ম্যানেজারের সঙ্গে দর কষাকষি শুরু করেন। শেষ পর্যন্ত দরদাম করে ২০ হাজার টাকায় রফা হয়। চুক্তি অনুযায়ী মঙ্গলবার দুপুরে কেমিক্যালের বিশেষ পাউডার মাখানো সেই টাকা নিয়ে সরাসরি কৃষ্ণচন্দ্রের অফিসে পৌঁছে যান অসীম সিকদার। দপ্তরের আনাচে-কানাচে তখন সাধারণ পোশাকে তক্কে তক্কে ওৎ পেতে ছিলেন দুর্নীতি দমন শাখার গোয়েন্দারা। অসীমবাবু টাকা বের করে এগিয়ে দিতেই লোভ সামলাতে না পেরে কৃষ্ণচন্দ্রবাবু যেই না সেই ফিনাইলফথ্যালিন মাখানো টাকায় হাত দিয়েছেন, অমনি চারদিক থেকে ঘিরে ধরে তাঁকে হাতেনাতে পাকড়াও করেন তদন্তকারীরা। দপ্তরের ভেতরেই শুরু হয় ম্যারাথন জেরা। টানা প্রায় ১০ ঘণ্টার চরম নাটকীয় জিজ্ঞাসাবাদের পর অবশেষে রাতে তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার করা হয়।

ধৃত কৃষ্ণচন্দ্র দাসের মূল বাড়ি বহরমপুরে। ২০২০ সালে তিনি নিউ ব্যারাকপুর বিদ্যুৎ দপ্তরের স্টেশন ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে আসেন। স্থানীয় পুরাতন বাজারের একটি আবাসনে স্ত্রী ও দুই মেয়েকে নিয়ে ভাড়া থাকতেন তিনি। স্থানীয় অধিবাসীদের দাবি, প্রলয়ঙ্করী আমফান ঘূর্ণিঝড়ের সময় যখন গোটা এলাকার বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ লন্ডভন্ড হয়ে গিয়েছিল, তখন কৃষ্ণচন্দ্রবাবু অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে দিনরাত এক করে কাজ করে বিদ্যুৎ পরিষেবা স্বাভাবিক করেছিলেন। সেই সৎ ও দক্ষ বলে পরিচিত কর্মকর্তা এভাবে স্রেফ ঘুষের টাকায় হাত দিয়ে হাতেনাতে গ্রেপ্তার হবেন, তা ভেবেই হতবাক এলাকাবাসী।

প্রোমোটার অসীমবাবুর অভিযোগ, এই চক্রে শুধু স্টেশন ম্যানেজার একা নন, বিদ্যুৎ দপ্তরের আরও কয়েকজন অসাধু কর্মী ও আধিকারিক জড়িত রয়েছেন। তদন্তকারীদের কাছে তাঁদের নাম-ধাম ইতিমধ্যেই জমা দিয়েছেন তিনি। সেই সঙ্গে স্টোররুমে ঘুষের টাকা নেওয়া প্রথম ব্যক্তিটিকেও চিনিয়ে দিয়েছেন তিনি। পুরো বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে বিএসডিএল ও তদন্তকারী সূত্রের খবর। একই সঙ্গে অসীমবাবু বিস্ফোরক অভিযোগ তুলে জানান, শুধু বিদ্যুৎ সংযোগই নয়, পুরসভা থেকে বিল্ডিং প্ল্যান পাশ করাতেও প্রোমোটারদের ২০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত অসাধু উপায়ে খরচ করতে হয়। তবে এই বিষয়ে এখনও পর্যন্ত পৃথক কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করা হয়নি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *