পেট্রাপোল স্থলবন্দরে তিন দিনের অচলবস্থা তুঙ্গে! ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে হঠাৎ কী ঘটল?

তিন দিনের টানা অচলাবস্থা ও উদ্বেগ কাটিয়ে অবশেষে স্বাভাবিক ও স্বাভাবিক ছন্দে ফিরল ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উত্তর ২৪ পরগনার পেট্রাপোল স্থলবন্দর। শ্রমিকদের কাজের সুষম ভাগাভাগি এবং বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের মধ্যে কাজের নির্দিষ্ট অনুপাত বণ্টন নিয়ে তীব্র বিবাদের জেরে গত ১ নভেম্বর থেকে সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল এই আন্তর্জাতিক বন্দরের পণ্য লোডিং ও আনলোডিংয়ের সমস্ত কাজ। এর সরাসরি প্রভাবে বাংলাদেশ থেকে আমদানিকৃত পণ্যবাহী শত শত ট্রাক সীমান্তে আটকে পড়ে এবং দুই দেশের বাণিজ্যে ব্যাপক স্থবিরতা তৈরি হয়। অবশেষে বুধবার একাধিক বৈঠকের পর উভয় পক্ষের সমঝোতায় জট কাটতেই পুনরায় কাজে ফিরেছেন শ্রমিকরা। পুরোদমে শুরু হয়েছে পণ্য খালাস ও লোডিংয়ের কাজ। দীর্ঘ তিন দিন পর চাকা ঘোরায় স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন সীমান্ত বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়ী ও সাধারণ শ্রমিকরা।

পেট্রাপোল স্থলবন্দর সূত্রে জানা গেছে, এখানে ল্যান্ড পোর্টস অথরিটি অব ইন্ডিয়া (LPAI) তালিকাভুক্ত প্রায় ৮০০ থেকে ৯০০ জন সাধারণ শ্রমিক প্রতিদিন কাজ করেন। কিন্তু সম্প্রতি কোন শ্রমিক সংগঠন ঠিক কতটা কাজ পাবে এবং কোন অনুপাতে কাজের বণ্টন হবে, তা নিয়ে শ্রমিকদের মধ্যে চরম অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই বিবাদ অত্যন্ত জটিল রূপ ধারণ করলে গত তিন দিন ধরে বন্দরে পণ্য তোলা ও নামানোর কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়।

শুল্ক দপ্তরের ক্লিয়ারিং বিভাগের সাধারণ সম্পাদক কার্তিক চক্রবর্তী ঘটনার বিবরণ দিয়ে জানান, এই আন্দোলনের জেরে বাংলাদেশ থেকে আসা প্রায় ১৮০টি বিভিন্ন পণ্যবাহী ট্রাক পেট্রাপোল বন্দরে আটকে ছিল। তবে এর মধ্যে অত্যন্ত পচনশীল ইলিশ ও অন্যান্য মাছের ট্রাক যাতে কোনোভাবে নষ্ট না হয়, তার জন্য বিশেষ প্রশাসনিক অনুরোধে ৮ থেকে ৯টি মাছের গাড়ি থেকে তড়িঘড়ি পণ্য খালি করা হয়েছিল। বাকি সাধারণ ট্রাকগুলি টানা আটকে থাকায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছিল। অবশেষে বুধবার থেকে পুরোদমে কাজ শুরু হওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এসেছে। খুব শীঘ্রই একটি স্থায়ী সমঝোতা চুক্তি সম্পন্ন হবে বলে আশা প্রকাশ করা হচ্ছে।

অন্যদিকে, বন্দর শ্রমিক সুব্রত দাস ক্ষোভ প্রকাশ করে অভিযোগ করেন, গত ২০ থেকে ৩০ বছর ধরে যারা ঐতিহ্যগতভাবে এই বন্দরে কাজ করছেন, একটি বিশেষ গোষ্ঠী তাদের অন্যায়ভাবে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছিল। শ্রমিকদের প্রকৃত দাবি ও সমস্যার কথা না শুনে বিভিন্ন মহলে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হচ্ছিল। তিনি দাবি করেন, বন্দরে সক্রিয় পাঁচটি শ্রমিক সংগঠনের মধ্যে আগে থেকেই একটি নির্দিষ্ট অনুপাতে কাজের বণ্টন ছিল। বিএমএস (BMS)-কে ৭৮ শতাংশ এবং বহু বছর ধরে যুক্ত থাকা অন্যান্য সাধারণ শ্রমিকদের ২২ শতাংশ কাজ দেওয়ার বিষয়ে যে নীতি ছিল, তা লঙ্ঘন করাতেই জটিলতা বাড়ে। শেষ পর্যন্ত পূর্বে নির্ধারিত সেই অনুপাত মেনেই কাজ পুনরায় শুরু করার সিদ্ধান্তে সায় দিয়েছেন সকলে।

সংগ্রামরত অপর এক শ্রমিক রবিন সরকার জানান, তাঁদের এই টানা আন্দোলনের মূল এবং একমাত্র দাবি ছিল কাজের পূর্ণ নিশ্চয়তা। টানা তিন দিন কাজ বন্ধ থাকায় সাধারণ শ্রমিকদের পরিবারে নুন আনতে পান্তা ফুরোনোর মতো সংকট তৈরি হয়। তাঁদের মূল লক্ষ্যই ছিল সততার সঙ্গে কাজ করে পরিবারের মুখে দু’মুঠো অন্ন তুলে দেওয়া। অবশেষে জট কেটে যাওয়ায় তাঁরা অত্যন্ত সন্তুষ্ট। তবে সাময়িক স্বস্তি মিললেও, ভবিষ্যৎ বিরোধ এড়াতে শ্রমিক সংগঠনগুলির এই কাজের বণ্টন নিয়ে স্থায়ী কী সমাধান আসে, এখন সেদিকেই চোখ সবার।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *