“মৃত্যু ফাঁদ জেনেও সরব না!” সমুদ্রের মারাত্মক গ্রাস ওড়িশার গ্রামে, নতুন সরকারি বাড়ি ভাড়া দিয়ে কেন ভিটেতে ফিরছেন বাসিন্দারা?

একদিকে উত্তাল সমুদ্রের ক্রমাগত গর্জন আর একের পর এক জমি ও ঘরবাড়ি গিলে খাওয়ার তাণ্ডব। অন্যদিকে, জীবন হাতে নিয়েও জন্মভিটে ও কয়েক প্রজন্মের স্মৃতি আঁকড়ে ধরে পেড়ে থাকার এক অদম্য লড়াই। ওড়িশার গঞ্জাম জেলার উপকূলবর্তী গ্রাম আর্যপল্লী (Aryapalli)-তে এখন শুধুই মৃত্যুভয় আর আতঙ্কের দিনরাত্রি। সমুদ্রের করাল থাবায় কি তবে চিরতরে ভারত মহাসাগরের তলদেশে তলিয়ে যাবে আস্ত একটি জনপদ? এই যক্ষ্মপ্রশ্নেই এখন রাত ঘুম উবেছে হাজার হাজার অধিবাসীর।
ভিটেমাটি ছেড়ে যেতে রাজি নন কেন গ্রামবাসীরা?
সমুদ্রের তীব্র ঢেউ ও উপকূল ভাঙনের কারণে বিগত কয়েক বছর ধরেই বিপন্ন আর্যপল্লী। ২০১৩ সালের ভয়াল ঘূর্ণিঝড় ‘ফাইলিন’-এর পর তৎকালীন রাজ্য সরকারের উদ্যোগে উপকূলীয় মানুষদের সুরক্ষায় বড়সড় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। ‘ওড়িশা ডিজাস্টার রিকভারি প্রজেক্ট’ (ODRP)-এর অধীনে আর্যপল্লী, পোদমপেটা, রম্ভা ও খাল্লিকোটের বাসিন্দাদের জন্য নিরাপদ স্থানে পাকা পুনর্বাসন বাড়ি বানিয়ে দেওয়া হয়।
কিন্তু প্রশাসনিক নথির হিসাবের সঙ্গে বাস্তবের পরিস্থিতি মিলছে না।
-
মাত্র ৩০% মানুষ রয়েছেন পুনর্বাসন কেন্দ্রে: সরকারি আবাসন পাওয়া পরিবারগুলোর মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষই নতুন পাকা বাড়ি ভাড়া দিয়ে ফের ফিরে এসেছেন বিপজ্জনক সমুদ্রঘেঁষা পুরনো ভিটেতে!
-
পরিষেবার চরম অভাব: বাসিন্দাদের চরম অভিযোগ, পুনর্বাসন এলাকায় পানীয় জলের মারাত্মক হাহাকার। নেই কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয় বা জরুরি পরিষেবা। মৌলিক সুযোগ-সুবিধার অভাবেই বাধ্য হয়ে সমুদ্রের মুখে জেনেও ফিরে আসতে হচ্ছে পুরনো মাটির ঘরে।
পাথরের বাঁধ বনাম সমুদ্রের আগ্রাসন
বর্তমানে উপকূল ভাঙন রুখতে আর্যপল্লীর তটরেখা বরাবর বড় বড় পাথর ফেলে বোল্ডার বাঁধ তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছে প্রশাসন। কিন্তু স্থানীয়দের মতে, রুশিকুল্যা নদীর মোহনা থেকে অন্ধ্রপ্রদেশ সীমান্ত পর্যন্ত সমুদ্র যেভাবে রুদ্ররূপ ধারণ করেছে, তাতে এই নামমাত্র পাথরের বাঁধ ঢেউয়ের ধাক্কা কতদিন সামলাতে পারবে তা নিয়ে বড়সর সংশয় রয়েছে। পাশের ‘পোদমপেটা’ গ্রাম ইতিমধ্যেই সমুদ্রের পেটে চলে যাওয়ার অভিজ্ঞতা থেকে আর্যপল্লীর অধিবাসীদের আতঙ্ক বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
অস্তিত্ব রক্ষার শেষ লড়াই
এটি কেবল মাত্র জমি বা কাঁচা ঘরবাড়ি বাঁচানোর লড়াই নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে শত বছরের স্মৃতি, সম্পর্ক আর শিকড়ের গভীর টান। উপযুক্ত ও মানসম্মত পরিষেবা না থাকলে মানুষকে জোর করে ভিটেছাড়া করা অসম্ভব। একদিকে প্রকৃতি ও সমুদ্রের নির্মম গ্রাস, আর অন্যদিকে প্রশাসনিক উদাসীনতা—এই দুইয়ের চাপে পড়ে সত্যিই কি শেষ পর্যন্ত ভারতের ভৌগোলিক মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে ঐতিহ্যবাহী আর্যপল্লী? উত্তর খুঁজছে তটবর্তী প্রতিটি প্রবীণ চোখ।