দীপাবলিতে ২১টি প্রদীপই কেন জ্বালানো হয়, ২২টি নয়? সংখ্যা তত্ত্বের এই ভয়ানক রহস্য জানলে চমকে যাবেন!

কড়া নাড়ছে আলোর উৎসব দীপাবলি। এই বিশেষ উৎসব মানেই আনন্দ, উল্লাস এবং অশুভ শক্তির বিনাশ ঘটিয়ে সুন্দরকে স্বাগত জানানোর প্রস্তুতি। কার্তিক মাসের এই বিশেষ উৎসবের প্রতিটি দিনের রয়েছে আলাদা আলাদা ধর্মীয়, পৌরাণিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব। আর এই দিনগুলিতে নির্দিষ্ট সংখ্যায় প্রদীপ জ্বালানোর এক সুপ্রাচীন প্রথা প্রচলিত রয়েছে, যার নেপথ্যে লুকিয়ে রয়েছে অত্যন্ত গভীর আধ্যাত্মিক ও জ্যোতিষশাস্ত্রীয় তাৎপর্য। কোন দিনে ঠিক কতগুলি প্রদীপ জ্বালানো শুভ এবং কেন, তা জেনে নেওয়া যাক একনজরে।

ধনতেরাস: ১৩টি প্রদীপের রহস্য
কার্তিক মাসের কৃষ্ণপক্ষের ত্রয়োদশী তিথিতে উদযাপিত হয় ধনতেরাস। ত্রয়োদশী তিথির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই এই দিনে মোট ১৩টি প্রদীপ জ্বালানোর নিয়ম রয়েছে।

এর মধ্যে প্রথম প্রদীপটি মৃত্যুর দেবতা যমরাজের উদ্দেশ্যে দক্ষিণ মুখ করে প্রজ্বলন করা হয়, যা পরিবারের সদস্যদের সমস্ত বিপদ ও অকালমৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করে।

বাকি প্রদীপগুলি স্বাস্থ্য, ধনদেবী মা লক্ষ্মী ও কুবেরকে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করে জ্বালানো হয়।

প্রাচীন বিশ্বাস অনুযায়ী, এই ১৩টি প্রদীপ বছরের ১৩টি চন্দ্র মাস কিংবা ১৩টি পবিত্র জীবনীশক্তির প্রতীক।

ভূত চতুর্দশী: ১৪ প্রদীপের আলোয় অশুভ শক্তির বিনাশ
অনেকেই এই দিনটিকে বাংলার ‘হ্যালোউইন’ বলেও অভিহিত করেন। কার্তিক মাসের এই চতুর্দশী তিথিতে বাড়িতে মোট ১৪টি প্রদীপ জ্বালানো বাধ্যতামূলক। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, এই বিশেষ রাতে আমাদের ১৪ জন্মের পূর্বপুরুষরা মর্ত্যধামে নেমে আসেন তাঁদের বংশধরদের আশীর্বাদ করতে। চতুর্দশী তিথি বলেই ১৪টি প্রদীপ জ্বালিয়ে পূর্বপুরুষদের শান্তির উদ্দেশ্যে প্রার্থনা করা হয় এবং এর প্রভাবে কোনো অশুভ শক্তি বাড়ির ধারেকাছে ঘেঁষতে পারে না। পাশাপাশি, এই দিন ১৪ শাক খাওয়ারও প্রচলন রয়েছে।

দীপাবলি: ২১ প্রদীপ জ্বালানোর নেপথ্যে কোন রহস্য?
দীপাবলির অমাবস্যার অন্ধকারে ধন-সম্পদের দেবী লক্ষ্মী ও ভগবান গণেশের পুজো করা হয়। বিশ্বাস করা হয়, এই রাতে মা লক্ষ্মী মর্ত্যলোকে নেমে আসেন, আর তাঁকে স্বাগত জানাতে ঘরের প্রতিটি কোণ আলোকিত করতে ২১টি প্রদীপ জ্বালানো হয়। এছাড়া ত্রেতাযুগে লঙ্কা জয় এবং ১৪ বছরের বনবাস শেষে এই দিনেই অযোধ্যায় ফিরেছিলেন শ্রীরামচন্দ্র, সীতা ও লক্ষণ। সেই আনন্দে অযোধ্যাবাসী সমগ্র নগরীকে প্রদীপের আলোয় সাজিয়ে তুলেছিলেন। (উল্লেখ্য, এর আগের দিন বাংলায় কালীপুজো উদযাপিত হবে)।

কেন ২১টি প্রদীপই জ্বালানো হয়, ২২টি নয়?
জ্যোতিষ ও আধ্যাত্মিক মতে, মানুষের শরীর ও প্রকৃতির মোট ২১টি উপাদানের শুদ্ধিকরণ করার উদ্দেশ্যে ঠিক ২১টি প্রদীপ জ্বালানো হয়:

৫টি জ্ঞানেন্দ্রিয় (চোখ, কান, নাক, জিভ, ত্বক)

৫টি কর্মেন্দ্রিয় (হাত, পা, মুখ, মলদ্বার, জননাঙ্গ)

৫টি প্রাণ বা শরীরের ভিতরের ৫টি বায়ু

৫টি মূল উপাদান বা পঞ্চভূত (ক্ষিতি বা মাটি, অপ বা জল, তেজ বা আগুন, মরুৎ বা বাতাস, ব্যোম বা আকাশ)

১টি মন বা আত্মা

সংখ্যা তত্ত্ব অনুযায়ী, ২১-এর যোগফল হয় (২+১=৩), যা দেবগুরু বৃহস্পতির সংখ্যা। প্রদীপের আলো ও এই শুভ সংখ্যার প্রভাবে ঘরের বাস্তুদোষ কেটে গিয়ে ইতিবাচক শক্তির (Positive Energy) প্রবল সঞ্চার ঘটে।

ভাইফোঁটা: ৫ প্রদীপের সুরক্ষাকবচ
ভাইফোঁটার উৎসবে ভাইয়ের দীর্ঘায়ু ও সুস্বাস্থ্য কামনায় ৫টি প্রদীপ জ্বালানোর নিয়ম রয়েছে। এই ৫টি প্রদীপ মূলত পঞ্চভূতের (মাটি, জল, আগুন, বাতাস, আকাশ) প্রতীক, যা ভাইয়ের রক্ষাকর্তা হিসেবে কাজ করে। অনেকে বিশ্বাস করেন, এই ৫ প্রদীপ উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব, পশ্চিম এবং আকাশ—এই ৫টি দিক থেকেই আসা সমস্ত বিপদ থেকে ভাইকে সুরক্ষিত রাখে।

পরিশেষে বলা যায়, মাটির প্রদীপের আধার আমাদের নশ্বর দেহ, তেল বা ঘি আমাদের কর্ম এবং তুলোর বাতি আমাদের অহংকার ও আত্মাকে নির্দেশ করে। প্রদীপ জ্বালানোর অর্থ হলো শরীরের ভেতরের সমস্ত অন্ধকার ও অজ্ঞানতা দূর করে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেওয়া। এই দীপাবলিতে সঠিক নিয়মে প্রদীপ জ্বেলে আপনার ঘরকেও করে তুলুন আলোয় ভরপুর!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *