আলোর উৎসবের আগেই আকাশে দুর্যোগের কালো মেঘ! বৃষ্টির জেরে ঘোর সংকটে হাওড়ার ঐতিহ্যবাহী বাজি শিল্প

আর হাতেগোনা মাত্র কয়েকদিন। তারপরেই আলোর রোশনাই ও বাজির শব্দে মুখরিত হয়ে উঠবে দীপাবলি ও কালীপুজোর রাত। তবে উৎসবের এই আনন্দের ঠিক আগেই আকাশ জুড়ে মেঘের ঘনঘটা আর লাগাতার বৃষ্টির পূর্বাভাস সাধারণ মানুষের পাশাপাশি গভীর চিন্তায় ফেলেছে হাওড়ার ঐতিহ্যবাহী বাজি প্রস্তুতকারক ও কারিগরদের। একের পর এক নিম্নচাপের খামখেয়ালিপনায় প্রকৃতির চাবুকে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে হাওড়ার বাগনানের বিখ্যাত বাজি শিল্প।
রোদের অভাবে বন্ধ উৎপাদন, বাজারজাত করা নিয়ে অনিশ্চয়তা: সাম্প্রতিক ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’-এর তাণ্ডব কাটার রেশ কাটতে না কাটতেই আবহাওয়া দপ্তরের নতুন দুর্যোগের সতর্কবার্তায় চরম উদ্বেগে পড়েছেন বাগনানের আগুনশী এলাকার বাজি ব্যবসায়ীরা। বাজি তৈরির সবচেয়ে অপরিহার্য শর্ত হলো প্রখর রোদ। মশলা মাখানো থেকে শুরু করে অন্তিম ফিনিশিং— প্রতি পদক্ষেপে কড়া রোদে বাজি শুকিয়ে নেওয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু এ বছর মৌসুমের শুরু থেকেই বৃষ্টির জেরে পর্যাপ্ত রোদের দেখা মিলছে না।
আগুনশী এলাকার অন্যতম প্রাচীন বাজি প্রস্তুতকারক সংস্থার কর্ণধার গুরুদাস সাউ আক্ষেপের সুরে জানান, প্রায় ৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে তাঁরা সমস্ত সরকারি নিয়মকানুন, শংসাপত্র ও বৈধ লাইসেন্স মেনেই এই ব্যবসা পরিচালনা করে আসছেন। কিন্তু রোদের অভাবে ঘরের ভেতরেই স্তূপাকার হয়ে পড়ে রয়েছে তৈরি বাজি। কালীপুজোর আগে বিভিন্ন বাজারে বরাত অনুযায়ী সময়মতো বাজি সরবরাহ করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ওপর কাঁচামালের দাম চড়া থাকায় এবার বাজির দাম কিছুটা বাড়তে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তিনি।
অসাধু ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য ও পুলিশের হেনস্তার অভিযোগ: নিয়ম মেনে ব্যবসা করার পরেও একশ্রেণির অসৎ ব্যবসায়ীর জন্য বৈধ শিল্পীদের বিপাকে পড়তে হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলেছেন গুরুদাস সাউ। তাঁর কথায়, “কিছু অসাধু ব্যবসায়ী কোনো লাইসেন্স বা সরকারি অনুমোদন ছাড়াই গোপনে নিষিদ্ধ ও বিপজ্জনক বাজি তৈরি করে বাজারে ছড়িয়ে দিচ্ছে। আর কোথাও কোনো ছোটোখাটো দুর্ঘটনা ঘটলেই নিয়ম মেনে চলা সৎ ব্যবসায়ীদেরও প্রশাসনের নজরদারিতে হেনস্তা ও আইনি সমস্যার মুখে পড়তে হয়।” এই অবৈধ কারবার রোধে প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন তিনি।
রুটি-রুজি হারিয়ে বিপাকে হাজার হাজার কারিগর: উৎসবের এই দিনগুলির দিকেই সারা বছর চাতক পাখির মতো তাকিয়ে থাকেন এলাকার হাজার হাজার সাধারণ বাজি কারিগর। বছরের মাত্র ৩ থেকে ৪ মাস এই শিল্পে কাজের সুযোগ মিলে থাকে, যার ওপর নির্ভর করে তাঁদের সারা বছরের সংসার চলে।
স্থানীয় কারিগর শ্রীকান্ত গায়েন জানান, সূর্যের আলোর কোনো বিকল্প না থাকায় বাজি শুকোতে মারাত্মক দেরি হচ্ছে। নির্দিষ্ট ডেডলাইনের মধ্যে মহাজনদের কাছে মালপত্র পৌঁছাতে না পারলে তাঁদের পথে বসার উপক্রম হবে।
সব মিলিয়ে, কালীপুজোর কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গেলেও বাগনানের আগুনশী অঞ্চলের বাজি কারখানাগুলোতে এখন আলোর বদলে অন্ধকারের ছায়া। আবহাওয়ার দ্রুত উন্নতি না হলে উৎপাদন ও জোগান ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ার প্রবল আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন ব্যবসায়ী ও শ্রমিক উভয় পক্ষই।