মণ্ডপ ঘিরে তন্ত্রের অদৃশ্য বাঁধন ও বাঁকুড়ার ৩ তান্ত্রিক সাধক! দক্ষিণ কলকাতার এই অলৌকিক পুজোয় কেন মা পরেন ফলের মালা?

মা কালীর নানা রূপ ও মূর্তির কথা আমরা জানি, কিন্তু দক্ষিণ কলকাতার বুকেই লুকিয়ে রয়েছে দেবী কালীর এক অভূতপূর্ব, বিরল ও মহাজাগ্রত রূপ। যেখানে দেবীর একটি বা দুটি নয়, রয়েছে ১০টি মাথা, ১০টি হাত এবং ১০টি চরণ! ১০টি হাতে শঙ্খ, চক্র, গদা, পদ্ম থেকে শুরু করে তীর-ধনুক সহ নানা অলৌকিক অস্ত্রে সজ্জিত দেবী। গত ৯৬ বছর ধরে এই অনন্য রূপেই পূজিত হয়ে আসছেন মা, যাঁকে ভক্তরা একনামে চেনেন ‘দশমুণ্ড মা’ বলে।

প্রতি বছর কালীপুজো ও দীপাবলির মরশুমে এই ঐতিহাসিক পুজোকে ঘিরে ভক্ত ও দর্শনার্থীদের মধ্যে চরম কৌতূহল ও আধ্যাত্মিক উন্মাদনা দেখা যায়।

কোথায় এই জাগ্রত মন্দির এবং কীভাবে পৌঁছাবেন? কলকাতার কালীঘাট মেট্রো স্টেশন থেকে বেরিয়ে অটো নিয়ে সোজা চলে যেতে হবে প্রতাপাদিত্য রোড ধরে চেতলার মেয়ার্স ক্লিনিকের কাছে। সেখান থেকে বিখ্যাত অগ্রণী ক্লাবের পাশ দিয়ে সরু গলি পেরিয়ে ৫ মিনিটের হাঁটা পথেই চোখের সামনে ভেসে উঠবে ‘দশমুণ্ড মা’-এর পুজো মণ্ডপ। এই পুজোর সার্বিক আয়োজন করে দক্ষিণ চেতলা সর্বজনীন মহাকালীপুজো কমিটি। এখানে দেবী মূলত শ্মশানকালী হিসেবে পূজিত হন।

তারাপীঠের ‘সাধুদা’ ও তান্ত্রিক পুজোর ইতিহাস: পুজো কমিটি সূত্রে জানা গিয়েছে, ১৯৩০ সালে এই পুজোর সূচনা করেছিলেন শুদ্ধানন্দ সরস্বতী নামের এক স্বনামধন্য তান্ত্রিক, যাঁকে স্থানীয় বাসিন্দারা পরম শ্রদ্ধায় ‘সাধুদা’ বলে ডাকতেন। সাধুদা তারাপীঠ মহাশ্মশানে দীর্ঘ বছর তন্ত্রসাধনা করেছিলেন। সেখান থেকেই তিনি একটি অতি প্রাচীন পিতলের ১০ মাথার কালী মূর্তি পান। পরবর্তীতে সেই মূর্তির আদলেই তৈরি করা হয় বর্তমানের ‘দশমুণ্ড মা’-এর প্রতিমা।

সাধুদা নিজের শেষ দিন পর্যন্ত এই পুজো করে গিয়েছেন। বর্তমানে ৯৬তম বর্ষে পদার্পণ করা এই পুজোয় সাধুদার নিয়ম ও প্রথা বিন্দুমাত্র বদলায়নি। আজও বাঁকুড়া থেকে তিনজন প্রখ্যাত তান্ত্রিক সাধক এসে সম্পূর্ণ তন্ত্রমতে এই মেগা পুজোর সমস্ত আচার-অনুষ্ঠান সম্পন্ন করেন।

নরকঙ্কাল ও রাতভর তান্ত্রিক হোমযজ্ঞের আধ্যাত্মিক পরিবেশ: পুজোর রাতে কোনো সাধারণ পুরোহিত এই মণ্ডপে পুজো করেন না। প্রথমে বিশেষ তন্ত্রবিদ্যার মাধ্যমে গোটা মণ্ডপ চত্বর বন্ধন করা হয়। এরপর প্রতিমার ঠিক সামনে একটি গভীর কুণ্ড খনন করে মোন মোন কাঠ ও খাঁটি গাওয়া ঘি দিয়ে শুরু হয় রাতভর যজ্ঞ। এই যজ্ঞকুণ্ডের ঠিক পাশেই রাখা হয় আসল নরকঙ্কাল ও মাথার খুলি!

অমাবস্যা তিথি যতক্ষণ বহাল থাকে, ঠিক ততক্ষণ ধরে চলে এই অলৌকিক তান্ত্রিক পুজো। অন্নভোগে দেওয়া হয় বিশেষ খিচুড়ি, তরকারি, পাঁচরকম ভাজা ও ফল। এছাড়া দেবীকে সুগন্ধি ফুলের মালার পাশাপাশি বিশেষ ফলের মালা দিয়ে সুসজ্জিত করার নিয়ম রয়েছে।

আহুতির প্রসাদে দুরারোগ্য রোগমুক্তি: স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দাদের দাবি, ‘দশমুণ্ড মা’ অত্যন্ত জাগ্রত। অতীতে এক যক্ষ্মা রোগীকে চিকিৎসকরা চূড়ান্ত জবাব দিয়ে দেওয়ার পর, সাধুদার যজ্ঞের আহুতির ফল ও প্রসাদ গ্রহণ করে সেই ব্যক্তি অলৌকিকভাবে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠেন! বিগত ৯৬ বছরে এমন বহু অলৌকিক রোগমুক্তি ও মানত পূরণের ঘটনা ঘটেছে এই মণ্ডপে, যা নিজ চোখে দেখেছেন এলাকার মানুষ।

দক্ষিণ চেতলা সর্বজনীন মহাকালীপুজো কমিটির সম্পাদক মনোজ দাস জানান, “আমরা শতবর্ষের দুয়ারে এসে দাঁড়িয়েছি। আজও সেই পুরনো তান্ত্রিক নিয়ম-নীতি ও ঐতিহ্য অক্ষুণ্ণ রেখেই বাঁকুড়ার তান্ত্রিক সাধকদের দিয়ে নরকঙ্কাল সামনে রেখে তন্ত্রমতে মায়ের পুজো পরিচালনা করা হচ্ছে।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *