পাহাড়জুড়ে ঘনঘন ধস ও বিপর্যয়! সরকার নয়, চরম সংকটে নিজেদের ভাগ্য বদলালেন হিমাচলের গ্রামবাসীরা

প্রকৃতির রুদ্ররূপ ও জলবায়ু পরিবর্তনের একের পর এক মারণ কামড়ে যখন হিমাচল প্রদেশের দৈনন্দিন জীবন ছারখার হওয়ার উপক্রম, ঠিক তখনই বাঁচার নতুন রাস্তা খুঁজে নিলেন স্থানীয় গ্রামবাসীরা। ধস কিংবা হরপা বানের পর শুধু সরকারি সাহায্য বা ত্রাণ পাওয়ার আশায় হাত গুটিয়ে না বসে, পরিস্থিতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে এক নজিরবিহীন লড়াই শুরু করেছেন মান্ডি, কুল্লু, শিমলা এবং সিরমৌর জেলার একাধিক গ্রাম পঞ্চায়েতের মানুষজন।
জলবায়ু পরিবর্তনকে আর দূরের কোনো আশঙ্কা নয়, বরং বর্তমানের চরম বাস্তবতা ধরে নিয়ে নিজেদের খেতখামার থেকে শুরু করে জলের উৎস বাঁচানো এবং বিপর্যয় মোকাবিলার নিজস্ব পরিকাঠামো গড়ে তোলার এই নিঃশব্দ বিপ্লব এখন নজর কাড়ছে গোটা দেশের।
🍏 আপেল ও ডালিম ছাঁটাই! খেতখামারে ফসল বদলের খেলা
পাহাড়ি রাজ্য হিমাচলের অর্থনৈতিক মূল চালিকাশক্তি হলো কৃষি ও উদ্যানপালন। কিন্তু আবহাওয়া পরিবর্তনের কোপে গত কয়েক বছরে ঐতিহ্যবাহী ফসল চাষে ব্যাপক ধস নামে। তবে হাল না ছেড়ে বিকল্পের খোঁজে নেমে সফল হয়েছেন কৃষকরা:
-
কুল্লু জেলার বাজৌরা: আপেল বাগানে রোগ এবং পরবর্তীতে ডালিম চাষেও ভাইরাসের থাবা বসায় নিঃস্ব হচ্ছিলেন চাষিরা। সেই ধাক্কা কাটাতে তারা বেছে নিয়েছেন জাপানি ফল পার্সিমন (Persimmon)। নতুন এই ফল চাষে যেমন রোগবালাই কম, তেমনই মিলছে দারুণ আর্থিক লাভ।
-
শিমলার সান্ধু গ্রাম: ২০টিরও বেশি কৃষক পরিবার সম্পূর্ণ কেমিক্যাল বা রাসায়নিক ছেড়ে বেছে নিয়েছেন ‘প্রাকৃতিক চাষ’ (Natural Farming)। এই পদ্ধতিতে খরচের ধাক্কা কম এবং চরম আবহাওয়ার মাঝেও ফসল সুরক্ষিত থাকছে।
-
সিরমৌরের পারারা গ্রাম: ঐতিহ্যবাহী আপেল চাষ একেবারে বন্ধ না করে বিশেষ আধুনিক প্রজাতির আপেলের সঙ্গে শুরু হয়েছে রসুনের যৌথ চাষ (Integrated Farming)।
💧 ঐতিহ্যবাহী ‘বাওড়ি’ সংস্কারে নারীবাহিনী ও গ্রামস্তরের ইমার্জেন্সি স্কোয়াড
শুধু চাষবাস নয়, পানীয় জলের সংকট মেটাতে পাহাড়ি মহিলাদের ভূমিকা এখন উদাহরণ তৈরি করেছে। সিরমৌরের থানা কাশোগা গ্রামে একসময় ৩৫টি ঐতিহ্যবাহী পাহাড়ি জলের কুণ্ড বা ‘বাওড়ি’ ছিল, যা শুকিয়ে নেমে এসেছিল মাত্র ১০টিতে। স্থানীয় মহিলাদের বিশেষ দল বিভিন্ন সংস্থার প্রশিক্ষণে ইতিমধ্যে ৫টি শুকনো বাওড়ি সম্পূর্ণ পুনরুজ্জীবিত করেছেন এবং বাকিগুলির কাজ দ্রুত গতিতে চালাচ্ছেন।
অন্যদিকে, ২০২৩ সালের প্রলয়ঙ্করী বন্যা ও পাহাড়ি ধসের অভিজ্ঞতা থেকে পাঠ নিয়ে শিমলার কাছে শোগি গ্রামের বাসিন্দারা গড়ে তুলেছেন নিজস্ব ‘গ্রাম বিপর্যয় ব্যবস্থাপনা কমিটি’। বিপর্যয় এলে কীভাবে সুরক্ষিত স্থানে সরতে হবে এবং আহতদের কীভাবে প্রাথমিক চিকিৎসা দিতে হবে—তার প্রশিক্ষণ এখন প্রতিটি গৃহস্থের নখদর্পণে।
📊 যৌথ সমীক্ষায় আন্তর্জাতিক গবেষকদের সিলমোহর
সম্প্রতি ‘কাউন্সিল অন এনার্জি, এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ওয়াটার’ (CEEW) এবং ‘ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট’ (ICIMOD)-এর পক্ষ থেকে হিমাচলের ১২টি গ্রাম পঞ্চায়েতে চলা এক বিস্তৃত সমীক্ষায় এই গ্রাউন্ড রিপোর্ট তুলে ধরা হয়েছে।
গবেষকদের মতে, গ্রামবাসী, স্থানীয় স্বনির্ভর গোষ্ঠী ও পঞ্চায়েত যখন সরকারি প্রকল্পের সহায়তায় একজোট হয়ে কাজ করে, তখন জলবায়ুর মতো বিশ্বব্যাপী সংকটকেও স্থানীয় স্তরে দক্ষতার সঙ্গে প্রতিহত করা সম্ভব হয়। হিমাচল প্রদেশের এই মডেল আগামী দিনে গোটা হিমালয় অঞ্চলের পার্বত্য রাজ্যগুলির জন্য নতুন দিশা দেখাচ্ছে।