ট্রেনে উঠলেই হাওয়া বসার বেঞ্চ! শুধু লোহার কাঠামো নিয়ে ছুটছে মেমু ট্রেন, রেলের চরম অব্যবস্থায় ক্ষোভে ফুটছে যাত্রীরা

ভারতীয় রেলের পক্ষ থেকে প্রতিনিয়ত যাত্রীদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি, ট্রেনের আধুনিকীকরণ এবং উন্নত নিরাপত্তার বড় বড় দাবি করা হলেও, বাস্তবের চিত্রটি যে কতটা ভয়ঙ্কর, তার প্রমাণ মিলল বিহারের দানাপুর রেলওয়ে বিভাগে। আরা এবং পাটনার মধ্যে চলাচলকারী ৬৩২১৪ নম্বর মেমু যাত্রীবাহী ট্রেনের ভেতরের যে ছবি প্রকাশ্যে এসেছে, তা রেলের সমস্ত দাবিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এক নির্মম সত্যকে সামনে এনেছে। দেখা গিয়েছে, ট্রেনটির বেশ কয়েকটি কোচে যাত্রীদের বসার বিন্দুমাত্র কোনো আসনই নেই! সিটের নিছক লোহার কাঠামো পড়ে থাকলেও, গায়েব হয়ে গিয়েছে বসার আসল কাঠের বা কুশনের জায়গাটি!

পুরো ভাড়াও দিয়েও দাঁড়িয়ে যাতায়াত: আরা ও পাটনার এই ব্যস্ত রুটে প্রতিদিন হাজার হাজার চাকুরিজীবী, স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রী, ব্যবসায়ী এবং সাধারণ নিত্যযাত্রী যাতায়াত করেন। যাত্রীদের অভিযোগ, এই মেমু ট্রেনটিতে এমনিতেই সবসময় উপচে পড়া ভিড় থাকে, তার ওপর ট্রেনটি প্রায়শই নির্ধারিত সময়ের চেয়ে দেরিতে চলে। এখন আবার বসার ব্যবস্থা পুরোপুরি উধাও হয়ে যাওয়ায় প্রতিদিনের যাতায়াত এক সাক্ষাৎ নরকযন্ত্রণায় পরিণত হয়েছে।

কোচে সিট না থাকায় বয়স্ক মানুষ, মহিলা এবং দূরের যাত্রীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়েই গন্তব্যে পৌঁছাতে হচ্ছে। এক নিত্যযাত্রী দুর্গেশ কুমার ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, “রেল কর্তৃপক্ষ আমাদের এই কষ্টের কথা কোনো দিনই কানে তোলে না। আমরা পুরো টিকিট কেটে যাতায়াত করি, অথচ ট্রেনে ওঠার পর একটু বসার জায়গাটুকুও পাই না। গত কয়েকদিন ধরে এই শোচনীয় অবস্থা নিজ চোখে দেখছি, অথচ কোনো হেলদোল নেই!”

সিট চুরি নাকি চরম গাফিলতি? প্রশ্ন উঠছে নিরাপত্তা নিয়ে: সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, ট্রেনের কোচ থেকে আস্ত সিটগুলি কীভাবে গায়েব হয়ে গেল? যদি এগুলি চোরেরা নিয়ে গিয়ে থাকে, তবে রেল ইয়ার্ড বা কারশেডের রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তা কোথায় গেল? রেলের ইয়ার্ড এবং রক্ষণাবেক্ষণের প্রতিটি কোণায় সিসিটিভি ক্যামেরা থাকা সত্ত্বেও কীভাবে এমন ঘটনা ঘটা সম্ভব? এই ঘটনায় রেলের সম্পত্তির নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আরপিএফ (RPF) এবং জিআরপি (GRP)-এর ভূমিকা নিয়েও বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন ঝুলে গেছে। সাধারণ যাত্রীদের প্রশ্ন—রেলের কোচের ভেতরের সিটই যদি সুরক্ষিত না থাকে, তবে যাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়ে বড়াই করার অর্থ কী?

কী সাফাই দিল রেল প্রশাসন? যাত্রীদের তীব্র ক্ষোভ ও গণমাধ্যমের হস্তক্ষেপে অবশেষে নড়েচড়ে বসেছে রেল। দানাপুর বিভাগীয় রেলওয়ে ম্যানেজার (DRM) বিনোদ কুমার স্বীকার করে নিয়েছেন যে, ট্রেনের ওই আসনগুলি যাত্রীদের বসার পক্ষে সম্পূর্ণ অনুপযুক্ত। তিনি আশ্বাস দিয়ে জানিয়েছেন, “ঘটনার উচ্চপর্যায়ের তদন্ত শুরু হয়েছে এবং দ্রুত প্রতিকারের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। ওই ক্ষতিগ্রস্ত কোচটিকে ট্রেন থেকে অবিলম্বে সরিয়ে ফেলা হবে। প্রাথমিক তদন্তে মনে হচ্ছে, আমাদের কোনো না কোনো কর্মীর চরম অবহেলার ফলেই এই ঘটনা ঘটেছে।” রেলওয়ের জনসংযোগ আধিকারিকও খুব শীঘ্রই সমস্যা সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তবে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—যাত্রীদের এই হেনস্থার দায় কে নেবে?

Rick Sarkar
  • Rick Sarkar

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *