অস্ত্রের দোকান লুট, পুলিশের ওপর মোলোটভ ককটেল হামলা! জার্মানির ৩৪ শহরে জেন-জি’র রক্তক্ষয়ী বিদ্রোহে তোলপাড় বিশ্ব

জীবনযাত্রার অনিয়ন্ত্রিত মূল্যবৃদ্ধি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বাজেট ছাঁটাই এবং বাধ্যতামূলক সামরিক সেবার আদেশের বিরুদ্ধে ইউরোপের পরাশক্তি জার্মানিজুড়ে শুরু হওয়া তরুণ প্রজন্মের আন্দোলন এবার এক ভয়াবহ ও সহিংস রূপ ধারণ করল। দিনের বেলা শান্তিকামী ব্যানার-স্লোগানে কর্মসূচি শুরু হলেও, শনিবার সন্ধ্যা নামতেই দেশের আর্থিক রাজধানী ফ্রাঙ্কফুর্টসহ একাধিক প্রধান শহরের রাজপথ রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। মুখোশধারীদের তাণ্ডব, শো-রুম ভাঙচুর, ব্যাপক লুটপাট এবং পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের নজিরবিহীন রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে কার্যত স্তব্ধ হয়ে পড়েছে দেশটির স্বাভাবিক জনজীবন।
💥 ৩৪টি শহরে একযোগে দাবানল: ফোকাসে ফ্রাঙ্কফুর্ট
‘জেন জি রেগেল্ট’ (Gen Z regelt) নামক একটি প্রভাবশালী যুব সংগঠনের আহ্বানে শনিবার জার্মানির প্রায় ৩৪টি ছোট-বড় শহরে একযোগে এই বিশাল প্রতিবাদ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছিল। তবে সবচেয়ে আশঙ্কাজনক ও থমথমে পরিস্থিতি তৈরি হয় ফ্রাঙ্কফুর্টের প্রাণকেন্দ্রে।
সন্ধ্যা গড়াতেই একদল মুখ ঢাকা দুষ্কৃতী ও চরমপন্থী ফ্রাঙ্কফুর্টের মূল বাণিজ্যিক এলাকায় ঢুকে পড়ে এবং একের পর এক নামী ব্র্যান্ডের শো-রুম ও সাধারণ দোকানের কাচ ভেঙে বেপরোয়া লুটপাট চালাতে থাকে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ও বিশৃঙ্খলা থামাতে পুলিশ বাহিনীর জওয়ানরা এগিয়ে এলে তাঁদের লক্ষ্য করে ছোড়া হয় প্রাণঘাতী পেট্রোল বোমা (মোলোটভ ককটেল), কাঁচের বোতল ও শক্তিশালী বাজি।
এমনকি একটি নামী অস্ত্রের দোকানে হামলা চালিয়ে আধুনিক বন্দুক চুরির চেষ্টার খবরও সামনে এসেছে। যদিও দ্রুত পদক্ষেপ করে এক সন্দেহভাজনকে আটক করে তার কাছ থেকে দুটি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করেছে পুলিশ।
🌊 রাজপথে জলকামান, ২০০-র বেশি গ্রেফতার
সহিংসতার আগুন ছড়িয়ে পড়া রুখতে ফ্রাঙ্কফুর্টের সবচেয়ে ব্যস্ততম কেনাকাটার সড়ক ‘ডি জাইল’ (Zeil) অবরুদ্ধ করে ঘিরে ফেলে পুলিশ। উন্মত্ত জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে নামানো হয় শক্তিশালী জলকামান। সাধারণ পথচারী ও আমজনতাকে দ্রুত শহরের কেন্দ্রস্থল ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাওয়ার জরুরি নির্দেশ জারি করা হয়।
শুধু ফ্রাঙ্কফুর্টই নয়, জার্মানির রাজধানী বার্লিন, কোলন এবং হামবুর্গের মতো বৃহৎ শহরগুলি থেকেও বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের খবর মিলেছে। বিভিন্ন স্থানে সরকারি সম্পত্তি ধ্বংস ও পুলিশের ওপর সরাসরি হামলায় জড়িত থাকার অপরাধে রাতারাতি ২০০ জনেরও বেশি বিক্ষোভকারীকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
⚖️ আন্দোলনকারীদের দাবি বনাম সরকারের তোপ
আন্দোলনের মূল আয়োজকরা অবশ্য এই ধ্বংসাত্মক সহিংসতার দায় নিতে অস্বীকার করেছেন। তাঁদের বক্তব্য, “আমাদের লড়াই সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ, শান্তির পক্ষে এবং সাধারণ মানুষের রুটি-রুজির ন্যায্য অধিকার আদায়ের জন্য। সরকার যেখানে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ক্রমাগত কমিয়ে আনছে, সেখানে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও যুদ্ধের পেছনে বিপুল অঙ্কের বাজেট বাড়িয়ে চলেছে। দেশের যুবসমাজ এই অন্যায় নীতি মেনে নেবে না।” সংঘর্ষের ঘটনা থেকে দূরত্ব বজায় রেখে তারা সাফ জানান, কোনো রূপ উগ্রপন্থা বা বিশৃঙ্খলা তাঁদের আসল লক্ষ্য ছিল না।
অন্যদিকে, প্রশাসন ও পুলিশ বিভাগের দাবি— সাধারণ শিক্ষার্থীদের এই শান্তিপূর্ণ ও ন্যায্য প্রতিবাদের সুযোগ নিয়ে অন্তত শ’খানেক উগ্রপন্থী ও চরমপন্থী গোষ্ঠী আন্দোলনের ভেতর অনুপ্রবেশ করেছিল। তারাই অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে এই অগ্নিকাণ্ড, দোকানপাট লুটতরাজ এবং রাষ্ট্রীয় সম্পত্তিতে ভাঙচুর চালিয়ে দেশকে অস্থির করার চক্রান্ত করেছে। বর্তমানে সবকটি শহরের প্রধান কেন্দ্রগুলিতে অতিরিক্ত সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েন করে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি রাখা হয়েছে।