“একটিও মৃত্যু নয় টানা ১২ মাস!” মাওবাদী নির্মূলের পর সিআরপিএফ-এর মহা-সাফল্যের নেপথ্যে কোন মেগা ট্রিক?

দেশের সবচেয়ে বড় কেন্দ্রীয় আধা সামরিক বাহিনী ‘সেন্ট্রাল রিজার্ভ পুলিশ ফোর্স’ বা সিআরপিএফ (CRPF)-এর ইতিহাসে যোগ হলো এক অভূতপূর্ব ও স্বস্তিদায়ক মাইলফলক। ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার মূল স্তম্ভ এই বাহিনী টানা ১২ মাস (পুরো ১ বছর) কোনো ‘অপারেশনাল ডেথ’ অর্থাৎ এনকাউন্টার বা অভিযান চলাকালীন জওয়ানের প্রাণহানি ছাড়াই কাজ শেষ করেছে। গত ৪৭ বছরের ইতিহাসে এমন ঘটনা এই প্রথম! সিআরপিএফ সূত্রে খবর, এর আগে শেষবার এমন নিরবচ্ছিন্ন ও নিরাপদ সময়কাল দেখা গিয়েছিল ১৯৭৯ সালের জানুয়ারি মাসে।

মহাপরিচালক জিপি সিং-এর ঐতিহাসিক ঘোষণা: সিআরপিএফ-এর মহাপরিচালক (DG) জিপি সিং এই অনন্য অর্জনের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে দেশবাসীকে জানান। তিনি নিশ্চিত করেছেন, বাহিনীতে শেষ অপারেশনাল মৃত্যু ঘটেছিল ২০২৫ সালের ৩০ অক্টোবর। তারপর থেকে দীর্ঘ এক বছর ধরে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ সব অভিযানে অংশ নেওয়া সত্ত্বেও দেশের কোনো সংঘাতপূর্ণ এলাকাতেই একজন জওয়ানেরও প্রাণহানি হয়নি। মহাপরিচালকের ভাষায়, বাহিনী যখন দেশের প্রতিটা হাই-রিফ্লেক্স ও সংবেদনশীল জোনে পুরোদমে মোতায়েন রয়েছে, ঠিক সেই সময়ে দাঁড়িয়ে এই অর্জন বাহিনীর জন্য এক বিরাট বড় সাফল্য।

কোন ম্যাজিকে এই অসম্ভব সম্ভব হলো? সেনা ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, সিআরপিএফ-এর এই ঐতিহাসিক জয়ের পেছনে রয়েছে তিনটি মূল স্তম্ভ:

  • উন্নত প্রযুক্তি ও আধুনিক অস্ত্র: প্রথাগত কৌশলের বাইরে গিয়ে অত্যাধুনিক সার্ভেইল্যান্স ড্রোন, মাইন-প্রুফ যান ও হাই-টেক অস্ত্রের ব্যবহার।

  • কৌশলগত প্রশিক্ষণ: বাস্তব পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যভিত্তিক (Intelligence-led) ঝটিকা অভিযান।

  • দ্রুততম উচ্ছেদ ও চিকিৎসা (Zero-delay Evacuation): কোনো জওয়ান সামান্য আহত হলেও তাঁকে দ্রুত হাই-স্পিড উদ্ধার ব্যবস্থার মাধ্যমে সেকেন্ডারি ও টার্শিয়ারি সুপার-স্পেশালিটি হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়ার পরিকাঠামো তৈরি হওয়া।

শূন্যের কোঠায় মাওবাদী প্রভাব: সিআরপিএফ মূলত দেশের সবচেয়ে উপদ্রুত তিনটি অঞ্চল—নকশাল প্রভাবিত এলাকা, জম্মু-কাশ্মীর এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলিতে নিয়মিত টহল ও অপারেশন চালায়। মাওবাদী হিংসা মারাত্মকভাবে কমে আসা এই সাফল্যের অন্যতম বড় কারণ। ভারতের মানচিত্রে একসময় ১০০টিরও বেশি জেলা নকশাল বা মাওবাদী অধ্যুষিত ছিল, আজ সরকারের দাবি অনুযায়ী দেশে আনুষ্ঠানিকভাবে আর একটিও মাওবাদী প্রভাবিত জেলা অবশিষ্ট নেই।

উল্লেখ্য, ২০২৪ এবং ২০২৫ সালের প্রথমার্ধেও ছত্তিশগড়, মণিপুর ও জম্মু-কাশ্মীরে একাধিক জওয়ানের শহীদ হওয়ার ঘটনা ঘটেছিল। তবে কৌশল বদলানোর পর গত এক বছরে চিত্রটা সম্পূর্ণ পাল্টে গিয়েছে।

নির্বাচনী সুরক্ষা, দাঙ্গাহাঙ্গামা দমন এবং সীমান্ত পেরিয়ে আসা সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে সিআরপিএফ সর্বদা সামনের সারিতে থাকে। টানা এক বছর জওয়ানদের কোনো প্রাণহানি না হওয়ার এই খবর বাহিনীর মনোবলকে যে বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে এবং জওয়ানদের পরিবারের দুশ্চিন্তা কমাবে, তা বলাই বাহুল্য।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *