“কারখানার গেটে রক্তপাত নিশ্চিত!” বিজেপির মাস্টারস্ট্রোমে তোলপাড় শিল্পাঞ্চল, এবার মুখোমুখি দুই শ্রমিক সংগঠন

রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস)-এর গুরুত্বপূর্ণ দুটি শাখা সংগঠন হলো ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) এবং ভারতীয় মজদুর সংঘ (বিএমএস)। বিজেপি যেখানে রাজনৈতিক অঙ্গন সামলায়, সেখানে বিএমএস দীর্ঘ দিন ধরে সংঘ পরিবারের একক শ্রমিক শাখা হিসেবে কাজ করে আসছে। কিন্তু সম্প্রতি সংঘ পরিবারের বহু পুরোনো সংস্কৃতি ও প্রথায় বড় বদল এনেছে বিজেপি। রাজনৈতিক দলের পাশাপাশি নিজেদের নতুন শ্রমিক সংগঠন (ট্রেড ইউনিয়ন সেল) আত্মপ্রকাশ করিয়েছে তারা। আর বিজেপির এই পদক্ষেপের পর থেকেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে—তবে কি এবার শিল্পাঞ্চলে আরএসএস-এর বিএমএস-এর সাথে বিজেপির নিজস্ব শ্রমিক সংগঠনের বড়সর সংঘাত তৈরি হতে চলেছে?

এই প্রশ্নটি সবচেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে পশ্চিম বর্ধমানের ব্যস্ততম শিল্পনগরী দুর্গাপুরে। কারণ, দীর্ঘ দিন ধরে দুর্গাপুরের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি কারখানা ও অফিসে বিএমএস-এর শক্ত ঘাঁটি রয়েছে। এতদিন তৃণমূল, কংগ্রেস কিংবা সিটু-র মতো বিরোধী ট্রেড ইউনিয়নগুলির সঙ্গে লড়াই করে সংগঠন টিকিয়ে রেখেছে তারা। কিন্তু বিজেপির হাত ধরে নিজস্ব শ্রমিক সংগঠন ময়দানে নামতেই শুরু হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক চর্চা।

দুর্গাপুরে কি ফের গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে রক্তপাতের দিন ফিরবে? শিল্পাঞ্চল দুর্গাপুরে শ্রমিক সংগঠনের দখল নিয়ে লড়াই বা গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব মোটেও অচেনা নয়। অতীতে তৃণমূলের দুই গোষ্ঠীর সংঘাতের জেরে একাধিকবার কারখানার গেট উত্তপ্ত হয়েছে। এবার গেরুয়া শিবিরের দুই শ্রমিক সংগঠনের আত্মপ্রকাশে সাধারণ শ্রমিকরাও আশঙ্কায় বুক বাঁধছেন। দুর্গাপুর ইস্পাত কারখানার এক ঠিকাকর্মী আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, “একটা শ্রমিক সংগঠন থাকলে শান্তিতে কাজ করা যায়। অতীতে গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের জেরে কারখানার গেটে রক্তপাত দেখেছি, পুলিশকে সামাল দিতে হয়েছে। এখন আবার নতুন করে কী অশান্তি শুরু হয় কে জানে!”

কী বলছে বিএমএস নেতৃত্ব? তবে সাধারণ শ্রমিকদের এই আশঙ্কাকে পুরোপুরি অমূলক বলে উড়িয়ে দিচ্ছে বিএমএস। পশ্চিম বর্ধমানের বিএমএস নেতা মৃণ্ময় বন্দ্যোপাধ্যায় স্পষ্ট জানান, “আমাদের মূল অভিভাবক আরএসএস। বিজেপির ট্রেড ইউনিয়ন সেল তৈরিতে বিএমএস-এর কোনো উদ্বেগ নেই। উচ্চ নেতৃত্ব এই বিষয়ে ওয়াকিবহাল। বিএমএস যেখানে পৌঁছাতে পারবে না, বিজেপির সেল সেখানে কাজ করবে। ফলে কোনো দ্বন্দ্বের প্রশ্নই ওঠে না।” তবে তিনি ইঙ্গিত দেন, বিজেপির নামে ইদানীং রাতারাতি ভুঁইফোঁড় কিছু সংগঠন গজিয়ে উঠছিল যা রোধ করতেই এই সুনির্দিষ্ট সেল গঠন করা হয়েছে।

বিজেপি ও বিরোধী কংগ্রেসের প্রতিক্রিয়া: অন্য দিকে, দুর্গাপুরের স্থানীয় বিজেপি নেতা কল্যাণ দুবে বিষয়টিকে অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে দেখছেন। তাঁর দাবি, “দুর্গাপুরের দিশেহারা শ্রমিকরা অবশেষে সঠিক নেতৃত্ব খুঁজে পাবেন। শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে এই সংগঠন শ্রমিকদের স্বার্থে লড়াই করবে।”

তবে বিরোধীরা এই ইস্যুকে ছাড়তে নারাজ। পশ্চিম বর্ধমান জেলা কংগ্রেসের সভাপতি তথা প্রবীণ শ্রমিক নেতা দেবেশ চক্রবর্তী তীব্র কটাক্ষ করে বলেছেন, “এটাই কি তবে সেই ডাবল ইঞ্জিন? খুব শিগগিরই কারখানার গেটে বিজেপি ও বিএমএস-এর মধ্যে কারখানার দখল নিয়ে দড়ি টানাটানি ও সংঘর্ষ দেখতে পাবেন। আর এর মাশুল গুণতে হবে সাধারণ শ্রমিকদের।”

সব মিলিয়ে, ভবিষ্যতে এই দুই শক্তি একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে নাকি কারখানার দরজায় আধিপত্যের লড়াই শুরু হবে, সেই উত্তর সময়ের গর্ভেই লুকিয়ে রয়েছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *