একই নামের জাদুতে ৩০ বছর ধরে শিক্ষক! আসল ব্যক্তি হলেন দरोগা, ভুয়ো মাস্টারমশাইয়ের কান্ডে চোখ কপালে তুলবে!

সরকারি চাকরি পাওয়ার লোভে কত ফন্দি-ফিকিরই না মানুষ করে! কিন্তু বিহার থেকে সামনে আসা জালিয়াতির এক এমনই অবিশ্বাস্য ও চাঞ্চল্যকর ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে, যা হার মানাবে যে কোনো থ্রিলার সিনেমাকেও। অন্যের নাম, পরিচয় এবং আদ্যোপান্ত জাল নথিপত্র ব্যবহার করে টানা ৩০ বছর ধরে সরকারি স্কুলের শিক্ষক হিসেবে চাকরি করার এক চাঞ্চল্যকর সত্য ফাঁস হলো। অবশেষে জেলা শিক্ষা দপ্তরের কড়া পদক্ষেপে চাকরি হারালেন সেই অভিযুক্ত ‘নকল’ শিক্ষক।

ঠিক কী ঘটেছিল ১৯৯৪ সালে?
পুরো ঘটনাটির সূত্রপাত ১৯৯৪ সালে। সে সময় বিহার লোক সেবা কমিশন (BPSC)-এর শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় সফল হন মনোজ কুমার নামের এক যুবক। তবে একই সময়ে তাঁর পুলিশ বিভাগে ‘দरोগা’ (Sub-Inspector) পদেও চাকরি হয়ে যায়। স্বভাবতই তিনি শিক্ষকতার সুযোগ ছেড়ে দিয়ে দरोগার সুনির্দিষ্ট পথ বেছে নেন এবং পুলিশ বাহিনীতে যোগ দেন। বর্তমানে তিনি ঝাড়খণ্ডের রাঁচিতে পুলিশ ইন্সপেক্টর পদে কর্মরত রয়েছেন।

কিন্তু আসল মনোজ কুমার শিক্ষক পদে যোগদান না করায় তাঁর সেই শূন্য আসনটি ফাঁকাই থেকে যায়। আর ঠিক এই সুযোগটিই নেয় এক প্রতারক।

আসল দरोগার পরিচয়ে ৩০ বছর শিক্ষকতা!
অভিযোগ, অন্য এক ব্যক্তি আসল মনোজ কুমারের নাম, বাবার নাম, বাড়ির ঠিকানা, প্যান কার্ড এবং সমস্ত শিক্ষাগত যোগ্যতার মূল শংসাপত্র জাল করে বা ব্যবহার করে ওই শিক্ষক পদে চাকরি হাসিল করে নেয়। এরপর দীর্ঘ তিন দশক ধরে বাঙ্কা জেলার পঞ্জवारा ও বারাহাট এলাকার বিভিন্ন সরকারি বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে দিব্যি চাকরি চালিয়ে যান তিনি। এই দীর্ঘ ৩০ বছরে ঘুণাক্ষরেও কেউ বুঝতে পারেনি যে চেয়ারে বসা মানুষটি আদতে আসল মনোজ কুমার নন!

যেভাবে ফাঁস হলো ৩০ বছরের পুরনো রহস্য
ঝাড়খণ্ডের দেওঘর জেলার মোহনপুর থানা (মামলা নং- ২১6/23)-র একটি পুলিশি তদন্তের সূত্র ধরেই এই মেগা জালিয়াতির জাল উন্মোচিত হয়। তদন্তের সূত্র ধরে তথ্য গিয়ে পৌঁছয় বিহারের বাঙ্কা জেলা শিক্ষা দপ্তরের কাছে। এরপর দেওঘর পুলিশ এবং বাঙ্কা জেলা শিক্ষা আধিকারিক যৌথভাবে তদন্ত শুরু করেন।

তদন্তের সময় অভিযুক্ত শিক্ষককে তাঁর ১৯৯৪ সালের বিপিএসসি পরীক্ষার পাশ করার কাগজ, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের মূল সার্টিফিকেট দেখাতে বলা হয়। কিন্তু তিনি কোনো মূল শংসাপত্র দেখাতে পারেননি, কেবল কিছু ডুপ্লিকেট কাগজ উপস্থাপন করেন। অন্যদিকে, রাঁচিতে কর্মরত আসল পুলিশ ইন্সপেক্টর মনোজ কুমারের সমস্ত নথি যাচাই করে দেখা যায় তাঁর কাগজপত্র একশো শতাংশ আসল।

তদন্ত এড়ানোর চেষ্টা ও বরখাস্তের নির্দেশ
তদন্ত চলাকালীন অভিযুক্ত শিক্ষক বারবার নথিপত্র জমা দেওয়া থেকে পালিয়ে বেড়ানোর চেষ্টা করেন। কখনো কলকাতায় চিকিৎসার বাহানা, আবার কখনো নানা অজুহাতে তিনি নোটিশের জবাব এড়িয়ে যান। এমনকি শিক্ষা দপ্তরের পাঠানো রেজিস্টার্ড চিঠিও ভুল ঠিকানার অজুহাতে ফেরত আসে।

অবশেষে জেলা কর্মসূচি আধিকারিক ও তদন্ত কমিটির রিপোর্টারদের চূড়ান্ত তদন্তে সমস্ত অভিযোগ প্রমাণিত হয়। এরপরই বিহার সরকারি সেবকের নিয়মাবলী ২০০৫ অনুযায়ী অভিযুক্ত ভুয়া শিক্ষক মনোজ কুমারকে तत्काल প্রভাব থেকে সার্বিকভাবে বরখাস্ত (Dismissed from Service) করার নির্দেশ জারি করে জেলা শিক্ষা দপ্তর। একই সঙ্গে তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। ৩০ বছর ধরে সরকারি ব্যবস্থার চোখকে ফাঁকি দিয়ে চলা এই জালিয়াতি প্রকাশ্যে আসতেই গোটা রাজ্যে পড়ে গেছে শোরগোল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *