মার্কিন শেয়ার বাজারে টেক-শেয়ারে মেগা ধস! ইনটেল-এনভিডিয়ায় ব্যাপক পতনে বিশ্বজুড়ে এআই বুদ্বুদ ফোটার আতঙ্ক

বিশ্ব শেয়ার বাজারে শুক্রবারের দিনটি প্রযুক্তি এবং সেমিকন্ডাক্টর কোম্পানিগুলির জন্য এক ধ্বংসাত্মক রূপ ধারণ করল। মার্কিন পুঁজিবাজারে প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ সংস্থাগুলির শেয়ারের দাম এক ধাক্কায় অস্বাভাবিক কমে যাওয়ায় চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি বিনিয়োগকারী।
সবচেয়ে বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে বিখ্যাত চিপ প্রস্তুতকারক সংস্থা ইনটেল (Intel)। শুক্রবার মাত্র এক দিনেই কোম্পানিটির শেয়ার দর ২৮.৬ শতাংশ ক্র্যাশ করেছে। শুধু ইনটেলই নয়, এনভিডিয়া (Nvidia), এএমডি (AMD), ডেল (Dell) এবং এইচপি (HP)-র মতো প্রথম সারির টেক জায়ান্টগুলির শেয়ারেও দেদার বিক্রি ও ধস লক্ষ্য করা গেছে। এই মেগা পতনের পর বিশ্ব অর্থনৈতিক মহলে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন— তবে কি এবার আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা এআই (AI)-এর ওপর ভর করে গড়ে ওঠা ফোলা ফানুসটি অবশেষে ফাটতে শুরু করল?
এক দিনে ৭৪৭ পয়েন্ট ভাঙল নেসড্যাক, অক্টোবরে গায়েব ২ ট্রিলিয়ন ডলার!
টেক শেয়ারের এই রক্তগঙ্গার সরাসরি আঘাত পড়েছে পুরো মার্কিন সূচকে। শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) নেসড্যাক কম্পোজিট সূচক (Nasdaq Composite Index) ২.৮৬ শতাংশ অর্থাৎ প্রায় ৭৪৭ পয়েন্ট হারিয়ে ২৫,৪৩৭ পয়েন্টে বন্ধ হয়েছে। শতাংশের হিসেবে গত ৫ জুনের পর নেসড্যাকে এটিই এক দিনে সবচেয়ে বড় পতন। ৬ অক্টোবরের রেকর্ড অল-টাইম হাই থেকে বর্তমানে ৭.৮ শতাংশ নিচে লেনদেন করছে এই সূচক।
অন্যদিকে, S&P 500 সূচক ১.৮২ শতাংশ পড়ে ৭,৫৮০ পয়েন্টে এসেছে এবং ডাও জোন্স (Dow Jones) ১.০৯ শতাংশ বা ৫৭২ পয়েন্ট নেমে ৫১,৭৭০ পয়েন্টে দিন শেষ করেছে। রয়টার্সের রিপোর্ট অনুযায়ী, শুধুমাত্র অক্টোবর মাসেই নেসড্যাক ১০০ (Nasdaq 100)-এর মার্কেট ভ্যালু থেকে ২ ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি সম্পদ হাওয়া হয়ে গেছে।
এনভিডিয়া, এএমডি ও ডেলের শেয়ারে হাহাকার
এই আর্থিক পতনের পেছনে মুখ্য ভূমিকা নিয়েছে ইনটেল এবং ই-কমার্স জায়ান্ট অ্যামাজনের দুর্বল ত্রৈমাসিক ফলাফল। এই হতাশাজনক ফলের কারণে পুরো সেমিকন্ডাক্টর ও সার্ভার সেক্টরে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে:
বিশ্বের বৃহত্তম এআই চিপ মেকার এনভিডিয়ার (Nvidia) শেয়ার ৪.২ শতাংশ পড়ে যায়।
প্রতিদ্বন্দ্বী চিপ সংস্থা এএমডি-র (AMD) শেয়ারে নেমে আসে প্রায় ১১ শতাংশের মেগা পতন।
সার্ভার প্রস্তুতকারী সংস্থা ডেল (Dell) ১০.৮ শতাংশ এবং এইচপি (HP) ৯.৬ শতাংশ দর হারিয়েছে।
বাজার বিশেষজ্ঞদের ধারণা, শুক্রবারের এই ধসের প্রভাব সোমবার (৩ নভেম্বর) এশিয়ার বাজারেও দেখা যেতে পারে। বিশেষ করে দক্ষিণ কোরিয়া এবং তাইওয়ানের শেয়ার বাজার মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, কারণ এই দুই দেশের মূল পুঁজিবাজার সম্পূর্ণভাবে টেকনোলজি শেয়ারের ওপর নির্ভরশীল।
ঋণের পাহাড়ে টেক সংস্থাগুলি, বিনিয়োগকারীদের মনে সংশয়
এআই প্রযুক্তির পরিকাঠামো গড়তে গিয়ে গত কয়েক বছরে আমেরিকান টেক ও সেমিকন্ডাক্টর কোম্পানিগুলি বন্ড ইস্যু করে বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়েছে। মেটা, অ্যামাজন এবং অ্যালফাবেট (গুগল) গত চার বছরে শত শত কোটি ডলারের ঋণ নিয়েছে। নতুন তথ্য অনুযায়ী, মেটা আরও ৯৭.৫ বিলিয়ন ডলার ফান্ডের পরিকল্পনা করছে এবং মাইক্রোসফট বন্ডের মাধ্যমে ২৫ বিলিয়ন ডলার তোলার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।
মরগান স্ট্যানলির (Morgan Stanley) অনুমান অনুযায়ী, আগামী বছর এআই ইনফ্রাস্ট্রাকচারে বিশ্বব্যাপী বিনিয়োগ ১ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে। কিন্তু এখন বিনিয়োগকারীরা প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন— এআই প্রযুক্তিতে কোটি কোটি ডলার ঢালা হলেও তার থেকে প্রকৃত আর্থিক রিটার্ন আসতে ঠিক কতটা সময় লাগবে? ঋণের এই পাহাড় এবং ধীর গতির আয়ের কারণে বিনিয়োগকারীদের রাতের ঘুম উবে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।