যে ভাষা বোঝেনই না, ইংরেজিতে নেওয়া হয়েছিল জবানবন্দি! ১৭ বছর পর যাবজ্জীবন সাজা খারিজ ঝাড়খণ্ড হাইকোর্টের

ইংরেজি না বুঝলেও ইংরেজিতেই জবানবন্দি! বিচার প্রক্রিয়ায় মারাত্মক ত্রুটির জেরে যাবজ্জীবন সাজা খারিজ, ঝাড়খণ্ড হাইকোর্টে মুক্ত নিরক্ষর গ্রামবাসী
না বুঝতে পারা একটি বিদেশি ভাষায় জবানবন্দি নথিভুক্ত করার মতো গুরুতর আইনি ত্রুটির খেসারত দিতে হলো বিচার ব্যবস্থাকে। ২০০৯ সালের একটি খুনের মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত ঝাড়খণ্ডের এক নিরক্ষর গ্রামবাসীকে শেষ পর্যন্ত বেকসুর খালাসের নির্দেশ দিল ঝাড়খণ্ড হাইকোর্ট। বিচারপ্রক্রিয়ায় মারাত্মক আইনি ত্রুটি এবং অপরাধের সপক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণের অভাবের কথা উল্লেখ করে আদালত এই যুগান্তকারী রায় দিয়েছে। দীর্ঘ ১৭ বছর আইনি লড়াইয়ের পর অবশেষে বড় স্বস্তি পেলেন অভিযুক্ত ছামরা ওরাঁও।
২০০৯ সালের ঘটনা: কী ছিল অভিযোগ?
ঘটনাটি ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের। ঝাড়খণ্ডের ছামরা ওরাঁও নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে তাঁর ভাইপোর স্ত্রী পরমেশ্বরী দেবীকে একটি কুয়োয় ডুবিয়ে খুন করার গুরুতর অভিযোগ ওঠে। সেই মামলায় দীর্ঘ বিচারপর্ব চলার পর ২০১৮ সালের এপ্রিলে রাঁচির নিম্ন আদালত ছামরাকে দোষী সাব্যস্ত করে। তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের পাশাপাশি ২০ হাজার টাকা জরিমানার নির্দেশ দেওয়া হয়। নিম্ন আদালতের সেই রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন ওই নিরক্ষর ব্যক্তি।
হাইকোর্টের রায়ে ফাঁস বিচার ব্যবস্থার মারাত্মক ত্রুটি
গত ১ অক্টোবর বিচারপতি আনন্দ সেন এবং বিচারপতি প্রদীপ কুমার শ্রীবাস্তবের ডিভিশন বেঞ্চ এই মামলার দীর্ঘ শুনানি শেষে নিম্ন আদালতের রায় সম্পূর্ণ খারিজ করে দেয়। আদালতের পর্যবেক্ষণে যে বিস্ফোরক তথ্যগুলি সামনে এসেছে, তা এককথায় নজিরবিহীন:
-
ভাষার দেওয়াল ও আইনি ত্রুটি: ফৌজদারি কার্যবিধির ৩১৩ ধারায় অভিযুক্তের জবানবন্দি নেওয়ার সময় মারাত্মক অবহেলা করা হয়েছিল। ছামরা ওরাঁও সম্পূর্ণ নিরক্ষর হওয়া সত্ত্বেও তাঁর জবানবন্দি ইংরেজিতে লেখা হয়। তাঁকে ইংরেজিতেই প্রশ্ন করা হয় এবং সেই ভাষাতেই উত্তর নথিভুক্ত করা হয়।
-
দোভাষীর অভাব: আদালত স্পষ্ট জানায়, যে ব্যক্তি ইংরেজি পড়তে, লিখতে বা বোঝেন না, তাঁকে সেই ভাষায় প্রশ্ন করা নীতিবহির্ভূত। ভাষার ব্যবধান দূর করতে কোনো দোভাষীর ব্যবস্থা করা হয়নি এবং তাঁর মাতৃভাষায় প্রশ্ন ও উত্তর অনুবাদ করা হয়েছিল—এমন কোনো প্রমাণও নথিতে ছিল না। এর ফলে আসামির ‘ন্যায্য বিচারের অধিকার’ (Right to Fair Trial) মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ হয়েছে।
প্রমাণের অভাব ও জমি বিবাদের তত্ত্ব
শুধু বিচারপ্রক্রিয়ার ত্রুটিই নয়, মামলার সাক্ষ্যপ্রমাণেও একাধিক ফাঁকফোকর খুঁজে পেয়েছে হাই কোর্ট। অভিযোগ করা হয়েছিল, ছামরা ওরাঁও মৃতাকে ধরে কুয়োয় ঝাঁপ দিয়েছিলেন এবং জলের তলায় তাঁকে জোর করে চেপে ধরে রেখেছিলেন। কিন্তু সাক্ষীদের বক্তব্যে মারাত্মক অসঙ্গতি ধরা পড়ে।
সবচেয়ে বড় কথা, সাক্ষীরা মৃতার শরীরে আঘাতের চিহ্ন থাকার কথা বললেও, ময়নাতদন্তের রিপোর্টে কোনো ধরনের অভ্যন্তরীণ বা বাহ্যিক আঘাতের প্রমাণ মেলেনি। এছাড়া দুই পক্ষের মধ্যে জমি নিয়ে বিরোধের পুরনো ইতিহাস থাকায় আদালত মনে করে, একটি সাধারণ দুর্ঘটনাকেও অভিযুক্তকে ফাঁসানোর জন্য পরিকল্পিত খুনের রূপ দেওয়া হয়ে থাকতে পারে।
সমস্ত দিক পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিবেচনা করে হাইকোর্ট জানায়, অভিযোগ প্রমাণিত করার মতো পর্যাপ্ত ও বিশ্বাসযোগ্য তথ্য প্রসিকিউশন পক্ষ পেশ করতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলস্বরূপ, নিম্ন আদালতের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের নির্দেশ খারিজ করে ছামরা ওরাঁওকে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে উচ্চ আদালত।