‘হয় ছেলেকে গুলি করো, নয় নগ্ন হয়ে হাঁটো!-পুলিশের চাঞ্চল্যকর পদক্ষেপ, চরম বিপাকে প্রভাবশালী পরিবার

তিলোত্তমা কলকাতায় মধ্যযুগীয় বর্বরতার ঘটনায় নতুন মোড়! প্রেমিক তরুণ, তাঁর বাবা এবং এক বন্ধুকে আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে নগ্ন করে প্রকাশ্য রাস্তায় হাঁটানোর অপরাধে এবার কড়া অ্যাকশনে নামল সরশুনা থানার পুলিশ। ঘটনার জল গড়াতেই গ্রেপ্তার হওয়া কিশোরীর বাবা ও মামাকে কোমরে দড়ি বেঁধে, হাফপ্যান্ট পরিয়ে খালি গায়ে এলাকার রাস্তায় ঘোরাল পুলিশ।
গত রবিবার বেহালার সরশুনা থানা এলাকার বসুন্ধরা পার্কের এই ঘটনায় তোলপাড় শুরু হয়েছিল রাজ্যজুড়ে। প্রেমের সম্পর্ক না মেনে নিয়ে প্রকাশ্য রাস্তায় প্রেমিক, তাঁর বাবা এবং এক বন্ধুকে নগ্ন করে হাঁটাতে বাধ্য করেছিল নাবালিকার পরিবার। সেই ঘটনারই প্রেক্ষিতে আজ মঙ্গলবার ধৃত অভিযুক্তদের ঘটনাস্থলে নিয়ে গিয়ে একইভাবে পুলিশি মহড়া দেওয়ানো হয়।
ঠিক কী ঘটেছিল লক্ষ্মীপুজোর রাতে?
ঘটনার সূত্রপাত লক্ষ্মীপুজোর রাতে। অত্যাচারিত যুবকের দাবি, তাঁর সঙ্গে এলাকার এক নাবালিকার প্রেমের সম্পর্ক ছিল। সেই কারণে তিনি সেদিন রাতে প্রেমিকার পাড়ায় তাঁর সঙ্গে দেখা করতে যান। রাস্তায় দাঁড়িয়ে দুজন কথা বলার সময় আচমকাই মেয়েটির হাত ধরেন ওই যুবক। ঠিক তখনই সেই দৃশ্য দেখে ফেলেন মেয়েটির মামার এক বন্ধু।
অভিযোগ, তিনি তৎক্ষণাৎ হুমকি দিয়ে নাবালিকার মামাকে ফোন করেন। দেখতে দেখতে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয় জনাছয়েক লোক। সেখানে তরুণকে চরম হেনস্থা করার পর জোরপূর্বক তাঁর বাবাকে ফোন করতে বাধ্য করা হয়। যুবক পরিস্থিতি বেগতিক দেখে বাবাকে ফোন করলে তাঁকেও ডেকে আনা হয় এবং টেনে নিয়ে যাওয়া হয় নাবালিকার মামার বাড়িতে।
“হয় ছেলেকে গুলি কর, না হলে নগ্ন হয়ে হাঁটো!”
পুলিশ ও আক্রান্ত পরিবার সূত্রের দাবি, নাবালিকার মামার বাড়িতে নিয়ে গিয়ে যুবকের বাবার সামনে তিনটি বিভৎস ও পৈশাচিক শর্ত রাখা হয়:
-
নিজের হাতে ছেলেকে গুলি করে খুন করতে হবে।
-
ধর্ষণের মিথ্যা মামলা ঘাড়ে নিয়ে জেলে যেতে হবে।
-
অথবা নগ্ন অবস্থায় রাস্তায় হাঁটতে হবে।
মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে এমন পরিস্থিতিতে প্রাণ বাঁচাতে বাধ্য হয়ে শেষ শর্তটিই বেছে নেন যুবক ও তাঁর বাবা। প্রকাশ্য রাস্তায় প্রায় ৫০ মিটার নগ্ন অবস্থায় তাঁদের এবং বন্ধুর পোশাক খুলিয়ে হাঁটাতে বাধ্য করা হয় এবং গোটা ঘটনার ভিডিও তুলে রাখা হয়।
স্থানীয়দের মানবিকতা ও রাজনৈতিক যোগসাজশ
ঘটনার ভয়াবহতায় সরশুনার ক্ষুদিরামপল্লির বাসিন্দারা হতবাক হয়ে পড়েন। পরবর্তীতে স্থানীয়দের একাংশের সক্রিয় ভূমিকাতেই ক্ষুব্ধ জনতার হাত থেকে রক্ষা পান আক্রান্ত যুবক ও তাঁর বাবা। স্থানীয়রাই তাঁদের উদ্ধার করে একটি গ্যারেজে আশ্রয় দেন এবং নতুন জামাকাপড় এনে দেন। পরে ক্ষুব্ধ জনতা অত্যাচারী পরিবারটির বাড়িতে ভাঙচুরও চালায়।
তদন্তে নেমে পুলিশ জানতে পেরেছে, ঘটনার মূল চক্রান্তকারী নাবালিকার মামা রাহুল বর্মন ও তাঁর সঙ্গীরা। রাহুল স্থানীয় ১২৬ নম্বর ওয়ার্ডের তৃণমূল কাউন্সিলরের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত ছিলেন এবং সেই রাজনৈতিক প্রভাবের দাপটেই এলাকায় এমন ঔদ্ধত্য দেখাত বলে অভিযোগ প্রতিবেশীদের।
তদন্তে পুলিশ
ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে এ পর্যন্ত কিশোরীর বাবা, মা এবং মামা— এই তিনজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করার পাশাপাশি আক্রান্তদের বয়ান রেকর্ড ও মেডিক্যাল পরীক্ষা করিয়েছে। মাথায় বন্দুক ঠেকানোর কথা বলা হলেও পুলিশ এখনো সেই আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করতে পারেনি। তবে এলাকার শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং অভিযুক্তদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে পুলিশ ইতিমধ্যেই আইনি প্রক্রিয়া জোরদার করেছে।