চোরবাগানের মর্মান্তিক ঘটনার পর এবার নড়েচড়ে বসল ‘ফাটাকেষ্ট’! মা কালীর দর্শনে নেওয়া হচ্ছে কোন চরম সিদ্ধান্ত?

দুর্গাপুজোর সপ্তমী সন্ধ্যায় চোরবাগান সর্বজনীন মণ্ডপে পদপিষ্ট হয়ে ১৯ জন দর্শনার্থীর মর্মান্তিক মৃত্যুর ট্র্যাজেডি ম্লান করে দিয়েছিল সমস্ত উৎসবের আলো। সেই শিউরে ওঠার মতো ঘটনার রেশ এখনও টাটকা তিলোত্তমায়। এই পরিস্থিতিতে কালীপুজোর মেগা ভিড় সামলাতে এবং দর্শনার্থীদের চরম নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে এবার নজিরবিহীন সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নিল উত্তর কলকাতার অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ও খ্যাতিমান পুজো ‘ফাটাকেষ্ট নব যুবক সংঘ’।

শহরের অন্যতম জনপ্রিয় ও হাই-প্রোফাইল এই ফাটাকেষ্টর কালীপুজো দেখতে প্রতি বছরই ভেঙে পড়ে দূর-দূরান্তের মানুষের ভিড়। চোরবাগানের ঘটনার যাতে বিন্দুমাত্র পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সেই লক্ষ্যেই এবার পুজো মণ্ডপের প্রবেশ ও বেরোনোর গেটের নিরাপত্তা ব্যবস্থার খোলনলচে বদলে ফেলা হচ্ছে।

উত্তম-অমিতাভের স্মৃতিবিজড়িত পুজোয় সতর্কতার ছোঁয়া
খুঁটি পুজোর পর থেকেই মধ্য কলকাতার ১৫ ফুটের সংকীর্ণ গলির অন্দরে জোরকদমে শুরু হয়েছে মণ্ডপ তৈরির কাজ। ঐতিহ্যবাহী এই পুজোর বিশেষত্ব হলো, একসময় এই মণ্ডপে মায়ের দর্শনে হাজির হয়েছেন মহানায়ক উত্তম কুমার থেকে শুরু করে বলিউডের শাহেনশাহ অমিতাভ বচ্চন ও তাঁর স্ত্রী জয়া বচ্চনের মতো দিগগজ সব ব্যক্তিত্বরা। রাতভর দর্শনার্থীদের ঢল সামলাতে গতানুগতিক ছক থেকে বেরিয়ে এবার বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে জরুরি বহির্গমন ও ভিড় নিয়ন্ত্রণে।

উল্লেখ্য, ২০২৫ সাল থেকেই কুমোরটুলির বিখ্যাত প্রতিমা শিল্পী মিন্টু পাল ফাটাকেষ্টর মা কালীর মূর্তি তৈরি করছেন। আগামী বুধবার সকালে মিন্টু পালের স্টুডিও থেকেই মণ্ডপে আনা হবে মায়ের প্রতিমা। আগামী শনিবার এই ঐতিহাসিক পুজোর শুভ উদ্বোধন।

গেট প্রশস্তকরণ ও বিশেষ ড্রাইভ
নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে বিস্তারিত জানিয়ে পুজো কমিটির সহ-সম্পাদক ধনঞ্জয় ধর বলেন, “এই বছর আমাদের পুজোর ৬৯তম বর্ষ। মহালয়া থেকেই মণ্ডপ তৈরির কাজ শুরু হয়েছিল। প্রতি বছরই আমাদের মণ্ডপের মঞ্চ উঁচু করে তৈরি করা হয় এবং নীচ দিয়ে দর্শনার্থীরা যাতায়াত করেন। চোরবাগানকাণ্ডের পর এবার সেই যাতায়াতের পথ আরও অনেকটাই প্রশস্ত করা হয়েছে। সংকীর্ণ গলির সিংহভাগ অংশ দর্শনার্থীদের যাতায়াতের জন্য পুরোপুরি ফাঁকা ও খোলা রাখা হচ্ছে। পুজোর উপকরণ আনার জন্য একটি মাত্র সরু পথ থাকবে, বাকি পুরো রাস্তাই বরাদ্দ থাকবে সাধারণ মানুষ ও স্থানীয়দের চলাচলের জন্য।”

বাজি প্রতিরোধে টিনের ছাদ ও মেডিকেল ক্যাম্প
মণ্ডপের ভেতরে ও বাইরে পর্যাপ্ত আলোর সুব্যবস্থার পাশাপাশি অন্য কোনো দুর্ঘটনা এড়াতে নেওয়া হচ্ছে ঢেলে সাজানো পরিকল্পনা। অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা নিয়ে ধনঞ্জয়বাবু জানান, বাজি বা আতশবাজির আগুন থেকে যাতে কোনো অঘটন না ঘটে, সেজন্য মণ্ডপের মাথার ত্রিপলের ওপর আলাদা করে টিনের চাদর বসানো হচ্ছে। মণ্ডপ সংলগ্ন দু’পাশের বাড়ির ছাদে রাখা থাকবে বালির বস্তা এবং বিশেষ প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক।

এছাড়াও জরুরি পরিস্থিতি সামাল দিতে মণ্ডপ চত্বরে সার্বক্ষণিক মোতায়েন থাকবে দমকলের গাড়ি, অসুস্থদের জন্য বিশেষ অ্যাম্বুল্যান্স এবং প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য হেলথ চেক-আপ ক্যাম্প।

প্রসঙ্গত, দুর্গাপুজোর সময় চোরবাগানে ঘটে যাওয়া ১৯ জনের প্রাণহানির ঘটনায় ইতিমধ্যেই অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বাধীন সিট (SIT) এবং পুলিশ যৌথভাবে তদন্ত চালাচ্ছে। ঘটনায় যুক্ত থাকার অভিযোগে ইতিমধ্যেই ৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং মঙ্গলবার মণ্ডপ শিল্পী সুশান্ত শিবানী পালকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলবও করা হয়েছে। সেই ঘটনা থেকে পাঠ নিয়েই এবার ফাটাকেষ্টর পুজোয় সুরক্ষাকেই সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *