“লাল-সাদা শাড়িতে ধুনুচি নাচ!”-তারেক রহমানের নতুন বাংলাদেশে কেমন ছিল উৎসবের আমেজ?

বাংলাদেশ জুড়ে লাল-সাদা শাড়ি পরা নারীদের ঢাকের তালে নেচে বিসর্জনের শোভাযাত্রায় এগিয়ে যাওয়া— সোশাল মিডিয়ায় এমন দৃশ্য দেখে অনেকেই হয়তো কলকাতা বা পশ্চিমবঙ্গের কোনো মণ্ডপ ভেবে ভুল করবেন। তবে এই দৃশ্য ময়মনসিংহের দুর্গাবাড়ী রোডের। সাম্প্রতিক বহু বছরের আতঙ্কের ছায়া কাটিয়ে এই বছর বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায় এক অন্য আবহ ও আনন্দে দুর্গাপুজো উদযাপন করল।

অতীতের নানা অপ্রীতিকর ঘটনা এবং মন্দির ও পাড়া-মহল্লায় হামলার ভীতি কাটিয়ে এ বছর সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জন্য নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-র সরকার এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন প্রশাসনের এই পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানিয়েছেন ওখানকার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নেতারা।

সরকারের কড়া পদক্ষেপ ও সর্বাত্মক নিরাপত্তা

গত ১৬ অক্টোবর উৎসবের সূচনাতেই বাংলাদেশ সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, “ধর্ম যার যার, কিন্তু রাষ্ট্র সবার… প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার আছে।”

শুধুমাত্র মুখের কথা নয়, এই বার্তা বাস্তবে রূপ দিতে দেশজুড়ে এক অভূতপূর্ব নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছিল:

  • দেশজুড়ে মোতায়েন: বাংলাদেশের প্রায় ৩৩,৮৬১টি পুজো মণ্ডপের নিরাপত্তায় মোতায়েন করা হয়েছিল ৬,০০০ বিশেষ নিরাপত্তা কর্মী, ৫৫০টি পিকআপ ভ্যান এবং ৪৫০টি মোটরসাইকেল স্কোয়াড।

  • রাজধানীর নিরাপত্তা: শুধু রাজধানী ঢাকাতেই মহানগর সর্বজনীন পুজো কমিটির ২৫৭টি মণ্ডপে কড়া নজরদারির জন্য ২,১০০ জন মেট্রোপলিটন পুলিশ কর্মী নিয়োজিত ছিলেন।

  • রাষ্ট্রপ্রধানদের মণ্ডপ পরিদর্শন: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজে ২০ অক্টোবর ঢাকার ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির সহ একাধিক মণ্ডপ পরিদর্শনে যান। এছাড়া রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও পুজো প্যান্ডেলে উপস্থিত থেকে সংখ্যালঘুদের আশ্বাস দেন।

ঢাকার ঢাকেশ্বরী মন্দিরের মহানগর সর্বজনীন পুজো উদযাপন সমিতির সাধারণ সম্পাদক শুভাশিস কুমার বিশ্বাস জানান, “গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে পুজোর সাথে হিংসার ভয় জুড়ে গিয়েছিল। তবে এই বছর সরকারের সার্বিক ব্যবস্থা সত্যিই প্রশংসনীয় ছিল।”

৩ দিনের সরকারি ছুটি ও আর্থিক সাহায্য বৃদ্ধি

শুধু পুলিশি পাহারাই নয়, ধর্মীয় উৎসবকে নির্বিঘ্নে উপভোগ করার জন্য বাংলাদেশ হিন্দু সংগঠনগুলোর দীর্ঘদিনের দাবি মেনে ছুটির মেয়াদও বাড়ানো হয়েছে। আগে অন্তর্বর্তী সরকার ১ দিন ছুটি বাড়িয়েছিল, নতুন বিএনপি সরকার তাতে আরও ১ দিন যোগ করায় মোট ৩ দিনের সরকারি ছুটি মেলে। সপ্তাহান্ত (Weekend) মিলিয়ে বাংলাদেশিরা টানা ৫ দিনের ছুটি উপভোগ করেছেন।

সরকারের মন্ত্রী ও সাংসদদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল নিজ নিজ এলাকায় পুজো মণ্ডপের শান্তি-শৃঙ্খলা তদারকি করার জন্য। সিরাজগঞ্জের পুজো উদযাপন সমিতির উপদেষ্টা সত্যনারায়ণ সারদা জানান, সরকার থেকে পুজো মণ্ডপগুলিতে আর্থিক অনুদানও আগের চেয়ে অনেক বাড়ানো হয়েছিল, যার ফলে দুষ্কৃতীরা কোনো গোলমাল করার সাহস পায়নি।

বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনার দ্রুত মোকাবিলা

অবশ্য পুজো যে একদম বিচ্ছিন্ন ঘটনা মুক্ত ছিল তা নয়। ১৮ অক্টোবর গাজীপুরের কোনাবাড়িতে শ্রী শ্রী রাধা গোবিন্দ মন্দিরে প্রতিমার সামনে কোরআনে আগুন দেওয়ার অভিযোগে ২৮ বছর বয়সী মোহাম্মদ ইউসুফ আলীকে আটক করা হয়। তবে নিরাপত্তা রক্ষী ও পুলিশের তাৎক্ষণিক তৎপরতায় কোনো বড় ধরনের অশান্তি বা সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়াতে পারেনি।

অতীতের যন্ত্রণা ও বিচার পাওয়ার আশা

২০২১ সালে কুমিল্লার নানুয়া দিঘির পারের পুজো মণ্ডপের ঘটনা বা ২০২৪ সালের পরবর্তী হিংসাত্মক পরিবেশের যে স্মৃতি বাংলাদেশের হিন্দু মনে গভীরভাবে চেপে বসেছিল, সেখান থেকে এই বছরের শান্তিপূর্ণ পুজো কিছুটা হলেও স্বস্তি এনে দিয়েছে। ময়মনসিংহে পোশাক শ্রমিক দীপু চন্দ্র দাস বা শরীয়তপুরের খোকন চন্দ্র দাসের ওপর নৃশংস আক্রমণের ঘটনাগুলোর বিচারের দাবি এখনও বকেয়া।

শুভাশিস কুমার বিশ্বাস বলেন, “আমরা ন্যায়বিচার চাই। আমরা এমন এক দিনের স্বপ্ন দেখি, যখন আমাদের নিজেদের ধর্ম ও উৎসব পালনের জন্য আর কোনো কড়া সশস্ত্র নিরাপত্তার প্রয়োজন হবে না।”

যদিও এই বছরের দুর্গাপুজোয় কোনো বড় ধরনের হিংসা ছাড়া উৎসবের সমাপ্তি বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের মনে নতুন এক আশার আলো জুগিয়েছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *