গ্যাসের আগুনের সরাসরি রুটি সেঁকে খাচ্ছেন? অজান্তে ক্যানসার ডেকে আনছেন না তো?

রুটি বা পাউরুটি ছাড়া আমাদের অনেকেরই সকালের জলখাবার কিংবা রাতের খাদ্যতালিকা সম্পূর্ণ হয় না। বাঙালি পরিবারগুলিতে তো বটেই, সারা দেশেই রুটি অত্যন্ত জনপ্রিয় ও পুষ্টিকর এক খাবার। তবে রান্নার সময় দ্রুত কাজ সারতে গিয়ে অনেকেই গ্যাসের ওভেনের সরাসরি আগুনের শিখায় রুটি সেঁকে নেন। আবার অনেকেই একটু মচমচে বা কড়া পোড়া রুটি কিংবা টোস্ট করা পাউরুটি খেতে ভালোবাসেন। কিন্তু অত্যন্ত সাধারণ ও প্রতিদিনের এই খাদ্যভ্যাসই কি অলক্ষ্যে আপনার শরীরে ক্যানসারের মতো মারাত্মক ও মারণ রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে? সাম্প্রতিককালে ক্যানসার বিশেষজ্ঞদের প্রকাশ করা আশঙ্কাজনক তথ্য কিন্তু এমনই সতর্কবার্তা দিচ্ছে।
রান্নার সময় অতিরিক্ত সেঁকা বা ঝলসানোর ফলে রুটি বা পাউরুটির গ গায়ে ছোট ছোট কালো পোড়া দাগ তৈরি হয়। বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, এর মূল কারণ হলো খাবারের মধ্যে থাকা কার্বোহাইড্রেট। রুটি বা পাউরুটি যখন উচ্চ তাপমাত্রায় অতিরিক্ত সেঁকা হয় বা পুড়িয়ে ফেলা হয়, তখন সেখানে এক ধরনের বিপজ্জনক রাসায়নিক যৌগ তৈরি হয়। বিজ্ঞানের পরিভাষায় এই ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদানটিকে ‘অ্যাক্রিলামাইড’ (Acrylamide) বলা হয়। মূলত এই রাসায়নিক বিক্রিয়ার কারণেই খাবারের অংশে কালো বা অতিরিক্ত কালচে ছোপ পড়ে যায়।
কৈলাশ দীপক হাসপাতালের বিখ্যাত ক্যানসার সার্জন ডক্টর মণীশ সাইনি এই বিষয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, তামাকজাত পণ্য বা সিগারেটের ধোঁয়ার মধ্যেও এই মারাত্মক ‘অ্যাক্রিলামাইড’ রাসায়নিকটি বিদ্যমান থাকে, যা মানবদেহে ক্যানসার সৃষ্টির অন্যতম প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। অতিরিক্ত মাত্রায় এই কেমিক্যাল যদি প্রতিনিয়ত আমাদের পরিপাকতন্ত্র ও রক্তে প্রবেশ করতে থাকে, তবে তা যেকোনো মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক ও প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। যদিও প্রতিদিনের খাবারের অল্প পরিমাণ অ্যাক্রিলামাইড থেকে তাৎক্ষণিকভাবে ক্যানসারের ঝুঁকি কতটা বৃদ্ধি পায়, তা নিয়ে এখনও সুনির্দিষ্ট ও চূড়ান্ত কোনো গবেষণাপত্র সামনে আসেনি; তবে প্রতিদিন ধারাবাহিকভাবে পোড়া বা কড়া সেঁকা রুটি খেলে শরীরে এই ক্ষতিকর উপাদানের মাত্রা ক্রমশ জমতে থাকে, যা ভবিষ্যতে ক্যানসার বা টিউমার সৃষ্টির অন্যতম সম্ভাব্য কারণ হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অধীনস্থ আন্তর্জাতিক ক্যানসার গবেষণা সংস্থা বা ‘ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যানসার’ (IARC)-এর পক্ষ থেকেও এই বিষয়ে আন্তর্জাতিক সতর্কতা জারি করা হয়েছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্যানসারের মতো মারাত্মক রোগের ঝুঁকি হ্রাস করতে অতিরিক্ত ভাজা, ঝলসানো বা পোড়া খাবার খাওয়া অবিলম্বে বন্ধ করা উচিত। মাংস হোক বা রুটি—উচ্চ তাপমাত্রায় সরাসরি পুড়িয়ে খাওয়া মোটেও স্বাস্থ্যসম্মত নয়। এর পাশাপাশি চিপস, কুড়কুড়ে বা কড়া করে ভাজা পাঁপড় খাওয়ার অভ্যাসও উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো জরুরি।
তাহলে প্রতিদিন সুস্থ ও নিরাপদ উপায়ে রুটি খাবেন কীভাবে? চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী, গ্যাসে সরাসরি আগুনের তীব্র শিখায় রুটি না সেঁকে চাটু বা তাওয়ার ওপর পরিষ্কার সুতির কাপড়ের সাহায্যে চেপে চেপে সেঁকে নেওয়া উচিত। একাধিক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, গ্যাসের ক্ষতিকর মিথেন ও হাইড্রোকার্বন গ্যাসের সরাসরি সংস্পর্শে রুটি সেঁকলে এক ধরনের বিষাক্ত গ্যাস উৎপন্ন হয়, যা শ্বাসনালী ও শরীরের ভেতরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ক্ষতি করে। তাই হালকা বাদামি রঙের নরম ও তুলতুলে রুটি তৈরি করে খাওয়াই শরীরের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর।