“সাজা শেষ, তবুও জেলমুক্তি নেই!”-বাংলাদেশের কারাগারে বন্দি প্রায় ২০০ ভারতীয়

আইনি সাজা বা হাজতবাসের মেয়াদ সম্পূর্ণ হওয়ার পরেও বিনা বিচারে ও দেশে ফেরার অপেক্ষায় বাংলাদেশের বিভিন্ন কারাগারে আটকে রাখা হয়েছে ১৫টি দেশের মোট ৪০৭ জন নাগরিককে। আর এই বন্দিদের মধ্যে অর্ধেকের বেশি, অর্থাৎ প্রায় ৫০ শতাংশের বেশিই ভারতীয় নাগরিক। ড্রাগ, মানবপাচার এবং সাইবার ক্রাইম বা তথ্যপ্রযুক্তিগত প্রতারণার মতো বিভিন্ন অভিযোগে তাঁদের কারাদণ্ড হয়েছিল। কিন্তু সাজার মেয়াদ ফুরিয়ে যাওয়ার পরেও মুক্তির আলো দেখতে না পেয়ে জেলেই দিন কাটাতে হচ্ছে তাঁদের।

শুক্রবার সে দেশের প্রথম সারির সংবাদপত্র ‘দ্য ডেইলি স্টার’-এর একটি চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে এই তথ্য সামনে এসেছে।

বাংলাদেশি জেলে বন্দি ভারতীয়দের প্রকৃত চিত্র

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলে বর্তমানে মোট ২৩৮ জন ভারতীয় নাগরিক বন্দি রয়েছেন। এর মধ্যে ১৬৮ জনেরই কারাবাসের মেয়াদ ইতিমধ্যেই শেষ হয়ে গিয়েছে। কিন্তু কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে দেশে ফেরার প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ না হওয়ায় তাঁরা এখনও মুক্তি পাননি।

তবে বাংলাদেশে বন্দি ভারতীয়দের প্রকৃত সংখ্যা এবং সাজা শেষে দেশে ফেরার অপেক্ষায় থাকা বন্দিদের ডেটা নিয়ে ভারতীয় হাই কমিশন এবং বাংলাদেশের প্রশাসনিক তথ্যের মধ্যে কিছুটা ফারাক রয়েছে। ঢাকায় ভারতীয় হাই কমিশনের কনসুলার বিভাগের এক আধিকারিক ‘দ্য ডেইলি স্টার’কে জানিয়েছেন, বাংলাদেশে সাজা শেষ হওয়ার পর দেশে ফেরার অপেক্ষায় থাকা ‘যাচাই করা’ ভারতীয় বন্দির আসল সংখ্যা মাত্র ২৫ জন। এক্ষেত্রে মূল সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে বন্দিদের সঠিক পরিচয় এবং তাঁরা আদৌ ভারতীয় নাগরিক কি না, তা নিয়ে ধোঁয়াশা।

নাগরিকত্ব যাচাইয়ের দীর্ঘসূত্রতা ও জটিলতা

ভারতীয় হাই কমিশনের ওই আধিকারিকের দাবি, বাংলাদেশের বিদেশ মন্ত্রক ১২১ জন বন্দির একটি তালিকা তাঁদের কাছে পাঠিয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, সেই তালিকায় থাকা অধিকাংশ বন্দির ব্যক্তিগত তথ্য ও নথিপত্র অত্যন্ত অপ্রতুল। ফলে তাঁদের ভারতীয় নাগরিকত্ব নির্দিষ্টভাবে যাচাই করা সম্ভব হচ্ছে না।

এই জট কাটাতে বন্দিদের সঙ্গে সরাসরি দেখা করার অনুমতি চেয়ে ইতিমধ্যেই বাংলাদেশের বিদেশ মন্ত্রকের কাছে আবেদন জানিয়েছে ভারতীয় হাইকমিশন। তবে সেই আবেদনের কোনো সদুত্তর এখনও আসেনি। যদিও কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ক্ষেত্রে নাগরিকত্ব যাচাইয়ের প্রক্রিয়া বর্তমানে চলমান রয়েছে।

এর আগে গত জুন মাসে সংবাদ সংস্থা পিটিআই-এর প্রতিবেদনে জানানো হয়েছিল, ৬ মাস আগের জেল পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সাজা শেষ হওয়ার পর দেশে ফেরার অপেক্ষায় থাকা ১৫২ জন বিদেশি বন্দির মধ্যে ১৪৮ জনই ছিলেন ভারতীয়। পরিচয় শনাক্তকরণের জটিলতা এবং কূটনৈতিক স্তরে দীর্ঘসূত্রতার কারণেই তাঁদের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন আটকে রয়েছে।

তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে মায়ানমার, নিরাপত্তার কড়াকড়ি

বাংলাদেশের কারাগারগুলিতে বিদেশি বন্দিদের সংখ্যার দিক থেকে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে মায়ানমারের নাগরিকরা। সে দেশের ১৩৩ জন বন্দি কারাগারে থাকলেও সাজা শেষ হওয়ার পর ফেরার অপেক্ষায় রয়েছেন মাত্র একজন। এছাড়া, দ্য ডেইলি স্টার-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের জেলে নাইজেরিয়ার ৬ জন এবং পাকিস্তান ও মালয়েশিয়ার ৩ জন করে নাগরিক বন্দি হিসেবে দিন কাটাচ্ছেন।

কারাগারের অভ্যন্তরীণ সুরক্ষার খাতিরে বিদেশি বন্দিদের সাধারণত সাধারণ কয়েদিদের থেকে আলাদা কক্ষে রাখা হয়। তাঁদের ওয়ার্ডের বাইরের চত্বরও সর্বদা সিসিটিভি ক্যামেরার কঠোর নজরদারিতে থাকে। তবে সাজা সম্পূর্ণ হওয়ার পরেও এভাবে বিদেশি বন্দিদের দীর্ঘকাল জেলে আটকে রাখার ফলে প্রশাসনিক চাপ ও জটিলতা ক্রমশ বাড়ছে বলে স্বীকার করে নিয়েছেন বাংলাদেশের জেল আধিকারিকেরা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *