“চিন সীমান্তে বড়সড় সংঘাত!”-ITBP ডিজির চাঞ্চল্যকর তথ্যে কি কেঁপে উঠল নয়াদিল্লি?

লাদাখ ও ডোকলামের তিক্ততা ভুলে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার মরিয়া চেষ্টার মাঝেই বিস্ফোরক তথ্য সামনে এল। অরুণাচল প্রদেশের সীমান্তে একাধিক জায়গায় ভারত ও চিনের সেনার মধ্যে বর্তমানে সরাসরি সংঘাত চলছে বলে চাঞ্চল্যকর দাবি করলেন ইন্দো-তিব্বত বর্ডার পুলিশ (ITBP)-এর ডিরেক্টর জেনারেল শত্রুজিৎ কাপুর। সরকারি স্তরে এই প্রথম উত্তর-পূর্ব ভারতের অরুণাচল সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে এমন স্পর্শকাতর ও খোলামেলা স্বীকারোক্তি প্রকাশ্যে এল, যা বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

ITBP ডিজির বিস্ফোরক মন্তব্য

চলতি বছরের জুলাই মাস থেকেই প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা (LAC) বরাবর এই উত্তেজনার পারদ চড়তে শুরু করেছিল। সেই সময় খবর মিলেছিল যে, অরুণাচলের তাকসিং এলাকায় ভারতের নির্ধারিত কিছু গুরুত্বপূর্ণ টহলদারি পয়েন্টে সরাসরি বাধা দিচ্ছে চিনের পিপলস লিবারেশন আর্মি (PLA)।

আইটিবিপি-র বার্ষিক সম্মেলনে যোগ দিয়ে ডিজি শত্রুজিৎ কাপুর স্পষ্ট ভাষায় জানান, “গত কয়েক দিনে অরুণাচলের একাধিক জায়গায় মুখোমুখি সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল এবং তা এখনও অব্যাহত রয়েছে।” তাঁর এই বক্তব্যে পরিষ্কার যে, গত সেপ্টেম্বরে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস (BRICS) সম্মেলনের সময়ও—যেখানে চিনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং উপস্থিত ছিলেন—ভারত ও চিনের সামরিক উত্তেজনা একটুও কমেনি।

সীমান্তের এই সংকটজনক পরিস্থিতিতে আইটিবিপি-র বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ‘শৌর্য কমান্ডো’দের ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেন ডিজি। উচ্চ পার্বত্য এবং দুর্গম এলাকায় যুদ্ধের জন্য বিশেষভাবে প্রস্তুত এই কমান্ডোরা এই সংঘাতে অসাধারণ সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন বলে তিনি জানান।

অস্বীকার বনাম স্থানীয়দের উদ্বেগ

এর আগে গত জুলাই মাসে ‘পিপলস পার্টি অফ অরুণাচল’ (PPA)-এর একটি তথ্য অনুসন্ধানকারী দল দাবি করেছিল যে, তাকসিং এবং আপার সুবনসিরি জেলায় চিনের আগ্রাসী কার্যকলাপ ও সেনার তৎপরতা বিপজ্জনকভাবে বেড়েছে। যদিও সেই সময় সরকারের পক্ষ থেকে এই দাবি খারিজ করে বলা হয় যে, অরুণাচল ভারতের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ এবং সেখানে কোনো অবৈধ দখলদারি হয়নি।

তবে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কিরেন রিজিজু অতীতে ‘ইন্ডিয়া টুডে’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্বীকার করেছিলেন যে, সীমান্তবর্তী কিছু এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দাদের গবাদি পশু চড়ানোর জমিতে যাতায়াত ও প্রবেশাধিকার নিয়ে কিছু উদ্বেগ ও সমস্যা অবশ্যই রয়েছে।

কেন্দ্রের বিরুদ্ধে সরব কংগ্রেস

আইটিবিপি ডিজির এই বক্তব্য প্রকাশ্যে আসার পরেই মোদী সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানিয়েছে কংগ্রেস। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের কাছে কড়া জবাব তলব করেছে প্রধান বিরোধী দল।

কংগ্রেস সাংসদ জয়রাম রমেশ সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি পোস্টে কড়া ভাষায় আক্রমণ করে লিখেছেন, চিনের প্রতি কেন্দ্রের তথাকথিত ‘নিয়ন্ত্রিত ছাড়’ দেওয়ার নীতি আজও অব্যাহত রয়েছে। একদিকে যেখানে চিনা সেনার সঙ্গে সংঘাতে আইটিবিপি জওয়ানদের বীরত্বের কথা সামনে আসছে, অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর প্রশাসন সম্পূর্ণ নীরবতা বজায় রেখেছে।

এছাড়া, গত সেপ্টেম্বরে এলএসি বরাবর শান্তি বজায় রাখতে অনুষ্ঠিত কর্পস কমান্ডার স্তরের বৈঠকের ফল কী হলো, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন জয়রাম রমেশ। তাঁর অভিযোগ, লাদাখের মতো অরুণাচলপ্রদেশের বহু গুরুত্বপূর্ণ টহলদারি পয়েন্টও ধীরে ধীরে হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে চিনের পক্ষ থেকে অরুণাচলের বিভিন্ন এলাকার নাম পরিবর্তন করা এবং জলনিরাপত্তার জন্য চরম হুমকি স্বরূপ ৬০ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার মেগা বাঁধ নির্মাণের বিষয়টিও সামনে এনেছেন তিনি।

সবমিলিয়ে, লাদাখের ছায়া কি এবার তবে উত্তর-পূর্বের অরুণাচল সীমান্তেও দীর্ঘায়িত হচ্ছে? কূটনৈতিক স্তরে নানাবিধ আলোচনার মাঝেই দুই দেশের সামরিক সংঘাতের এই নতুন তথ্য ভারত-চিন সম্পর্কে আগামী দিনে কোন মোড় নেয়, এখন সেটাই দেখার।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *