টাইগারের ওপর গুলিকাণ্ডের নেপথ্যে কে? কোটা থেকে গ্রেফতার তিন দুষ্কৃতী

বলিউড অভিনেতা টাইগার শ্রফের গাড়ি লক্ষ্য করে ছোড়া গুলিতে আহত হয়েছিলেন উমেশ চৌহান। তবে রোমাঞ্চকর এই ঘটনার শুরুতে তিনি ঘুণাক্ষরেও টের পাননি যে তাঁর শরীরে গুলি লেগেছে। ঘটনার আকস্মিকতায় প্রথমে তাঁর বুকে তীব্র যন্ত্রণা ও শ্বাসকষ্ট শুরু হয়, যা দেখে তিনি এবং আশেপাশের সকলে ভেবেছিলেন তাঁর বুঝি বড় কোনো হার্ট অ্যাটাক হয়েছে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে হাসপাতালে পৌঁছানোর পর চিকিৎসকদের কাছে তিনি জানতে পারেন যে হার্ট অ্যাটাক নয়, বরং সরাসরি গুলিবিদ্ধ হয়েছেন তিনি।
ঘটনার সূত্রপাত গত রবিবার রাতে। মুম্বইয়ের অভিজাত জুহু এলাকার একটি ফুটবল মাঠ থেকে যখন টাইগার শ্রফের গাড়িটি বাইরে বের হচ্ছিল, ঠিক তখনই সেই মুহূর্তটিকে ক্যামেরা বন্দি করার চেষ্টা করছিলেন উমেশ। প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে-কে দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, গাড়িটি যখন গেট দিয়ে বেরিয়ে আসছিল, তখন তিনি অভিনেতার ঠিক কাছাকাছিই দাঁড়িয়েছিলেন।
উমেশ সেই রোমহর্ষক মুহূর্তের বর্ণনা দিয়ে জানান, “আমি যখন ভিডিও রেকর্ড করছিলাম, ঠিক তখনই একটি জোরালো শব্দ শুনতে পাই। প্রথমে আমার মনে হয়েছিল সম্ভবত কোনো গাড়ির টায়ার ফেটে গেছে। কিন্তু তার পরেই আমি আমার বুকে প্রচণ্ড যন্ত্রণা অনুভব করতে শুরু করি।” এর কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁর শ্বাস নিতে মারাত্মক অসুবিধা হতে শুরু করে। প্রাণ বাঁচাতে তিনি সাহায্যের জন্য চিৎকার করতে শুরু করেন এবং অতিরিক্ত যন্ত্রণার কারণে অল্পসময়ের মধ্যেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। তিনি স্পষ্ট জানান, “আমি বুঝতেই পারিনি যে আমাকে গুলি করা হয়েছে। হাসপাতালে পৌঁছানোর পরই আসল সত্যটি বুঝতে পারি। প্রথমে আমার মনে হয়েছিল আমার বুঝি হার্ট অ্যাটাক হচ্ছে।”
প্রথমে তাঁকে জুহুর কুপার হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা করা হয়। পরবর্তীতে উন্নত ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসার প্রয়োজনে সেই রাতেই প্রায় ১২টা নাগাদ তাঁকে পারেলের কেইএম (KEM) হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়। মঙ্গলবার খোদ টাইগার শ্রফের মা হাসপাতালে এসে তাঁর সঙ্গে দেখা করেন এবং পরিবারের পাশে থাকার পাশাপাশি সব রকম সাহায্যের আশ্বাস দেন বলে জানিয়েছেন আক্রান্ত উমেশ।
কেইএম হাসপাতাল সূত্রে পাওয়া সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, বর্তমানে উমেশের শারীরিক অবস্থা সম্পূর্ণ স্থিতিশীল রয়েছে এবং তিনি চিকিৎসকদের কঠোর পর্যবেক্ষণে আছেন। স্বস্তির বিষয় হলো, এই আকস্মিক গুলিবর্ষণে তাঁর হৃদযন্ত্র কিংবা ফুসফুসের কোনো ধরনের গুরুতর ক্ষতি হয়নি। হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তিনি বর্তমানে হেমোডাইনামিক্যালি সম্পূর্ণ স্থিতিশীল আছেন। জেনারেল সার্জারি বিভাগের তত্ত্বাবধানে এমার্জেন্সি আইসিইউ-তে তাঁর চিকিৎসা চলছে। এর পাশাপাশি কার্ডিওভাসকুলার অ্যান্ড থোরাসিক সার্জারি বিভাগের বিশিষ্ট চিকিৎসকরাও তাঁর শারীরিক অবস্থার ওপর নিবিড় নজর রাখছেন এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে চিকিৎসকরা কোনো রকম অস্ত্রোপচার ছাড়াই তাঁর চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাঁর শারীরিক অবস্থার ধারাবাহিক উন্নতি এবং পরবর্তী সমস্ত পরীক্ষার রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করেই আগামী দিনের চিকিৎসা পরিকল্পনা করা হবে।
আক্রান্ত উমেশ মূলত উত্তরপ্রদেশের বাসিন্দা। জীবিকার তাগিদে তিনি মুম্বইয়ে গাড়িচালক এবং গৃহকর্মীর কাজ করেন। তাঁর সামান্য উপার্জনের ওপরই সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল রয়েছে তাঁর স্ত্রী এবং তাঁদের ছয় বছরের ছোট্ট ছেলে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তাঁদের পরিবারে আরও এক নতুন অতিথি আসার কথা রয়েছে। এমন একটি অত্যন্ত সংকটজনক মুহূর্তে পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী সদস্যের এই ধরনের আকস্মিক দুর্ঘটনা এবং ভবিষ্যৎ আর্থিক অনিশ্চয়তা নিয়ে গোটা পরিবারে চরম উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, রবিবার রাতে জুহুর পুষ্পা নারসি পার্কের ফুটবল মাঠ থেকে টাইগার শ্রফের গাড়ি লক্ষ্য করে এই চাঞ্চল্যকর হামলা চালানো হয়। প্রাথমিক তদন্তে পুলিশের অনুমান, একটি মোটরবাইকে চড়ে মোট তিনজন দুষ্কৃতী এসেছিল। তাদের মধ্যে দুজন সরাসরি অভিনেতার গাড়ি লক্ষ্য করে এলোপাথাড়ি গুলি চালায় এবং তৃতীয় জন বাইক স্টার্ট দিয়ে তাদের পালিয়ে যাওয়ার অপেক্ষায় ছিল। এই চাঞ্চল্যকর মামলায় তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ করে রাজস্থানের কোটা রেল স্টেশন থেকে তিন অভিযুক্তকে গ্রেফতার করেছে কোটা সিটি পুলিশ। পুনে-জয়পুর সুপারফাস্ট এক্সপ্রেসে পালানোর সময় তাদের পাকড়াও করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, ধৃতরা সকলেই নেপালে পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিল।
ধৃত তিন অভিযুক্তের নাম ঋত্বিক, ফুল সিং এবং রেহান। পুলিশের তরফ থেকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, সংবাদমাধ্যমে অপ্রাপ্তবয়স্ক বলে যে গুঞ্জন ছড়িয়ছিল, তা সম্পূর্ণ ভুল; ধৃতদের মধ্যে কেউ-ই নাবালক নয়। কোটার পুলিশ সুপার তেজস্বিনী গৌতম সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, এই অভিযুক্তদের একজনের সঙ্গে কুখ্যাত লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাংয়ের সহযোগী অনিল পণ্ডিতের প্রত্যক্ষ যোগাযোগ রয়েছে। এদিকে, এই হামলার দায় স্বীকার করে সোশ্যাল মিডিয়ায় ইতোমধ্যে একটি চাঞ্চল্যকর পোস্ট করা হলেও পুলিশ সেই পোস্টের সত্যতা এবং উৎস নিয়ে এখনও গভীর তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে।