মেদ ঝরানো ও ডায়াবেটিসের ওষুধেই কি মিলবে আলঝেইমার্স আর স্ট্রোক থেকে মুক্তি? গবেষণায় অলৌকিক সংকেত!

টাইপ ২ ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ এবং মেদ ঝরিয়ে ওজন কমানোর চিকিৎসায় জিএলপি-১ (GLP-1) গোত্রের ওষুধ বর্তমানে বিশ্বজুড়ে বেশ জনপ্রিয়। তবে সম্প্রতি সামনে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। নতুন এক জিনগত গবেষণা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, এই ওষুধগুলোর প্রভাব কেবল ওজন ও ব্লাড সুগার কমানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি আলঝেইমার্স (স্মৃতিভ্রংশ) এবং নির্দিষ্ট কিছু ধরনের ব্রেন স্ট্রোকের মতো জটিল স্নায়বিক রোগের বিরুদ্ধেও প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে।

ইউরোপীয়, পূর্ব এশীয় এবং আফ্রিকান বংশোদ্ভূত ব্যক্তিদের জিনগত তথ্য বিশ্লেষণ করে আন্তর্জাতিক গবেষকদের একটি দল এই পরীক্ষাটি চালিয়েছেন। তারা দেখতে চেয়েছেন, জিএলপি-১ রিসেপ্টর অ্যাগনিস্টের (GLP-1RAs) জৈবিক প্রতিক্রিয়া কোনো মানুষের স্ট্রোক বা আলঝেইমার্সে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কমাতে সক্ষম কি না। বিভিন্ন গোষ্ঠীর সম্মিলিত উপাত্তে উভয় রোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমার স্পষ্ট লক্ষণ ধরা পড়েছে। তবে গবেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, এখনই এই গবেষণাকে জিএলপি-১ ওষুধ দ্বারা আলঝেইমার্স বা স্ট্রোক পুরোপুরি প্রতিরোধের চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে ধরে নেওয়া যাবে না।

কী উঠে এসেছে এই গবেষণায়?
গবেষণার জন্য বিজ্ঞানীরা ‘মেন্ডেলিয়ান র্যান্ডমাইজেশন’ নামে একটি বিশেষ পদ্ধতি ব্যবহার করেন। বাস্তব জীবনে মানুষ সরাসরি জিএলপি-১ ওষুধ খাওয়ার পর কী ফল মিলছে তা না দেখে, তারা প্রাকৃতিকভাবে বিদ্যমান জিনগত বৈচিত্র্যকে বিশ্লেষণ করেন—যা জিএলপি-১ ওষুধের জৈবিক প্রভাবের বিকল্প হিসেবে কাজ করে। ৩,০২৬ থেকে শুরু করে ১৮ লক্ষেরও বেশি মানুষের বিশাল ডেটাসেট নিয়ে এই গবেষণাটি পরিচালিত হয়, যার মধ্যে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি ডায়াবেটিস, স্ট্রোক ও আলঝেইমার্সে আক্রান্ত রোগীও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।

কমেছে স্ট্রোক ও আলঝেইমার্সের ঝুঁকি
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইউরোপীয় বংশোদ্ভূতদের ক্ষেত্রে জিএলপি-১ জিনের প্রভাব ইস্কেমিক স্ট্রোকসহ সব ধরনের স্ট্রোকের ঝুঁকি লক্ষণীয়ভাবে কমায়। অন্যদিকে পূর্ব এশীয় ও আফ্রিকান অংশগ্রহণকারীদের ক্ষেত্রেও একটি প্রতিরক্ষামূলক প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে।

সবচেয়ে স্পষ্ট চিত্র ফুটে উঠেছে যখন বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর তথ্য একসঙ্গে যুক্ত করে ‘ক্রস-অ্যানসেস্ট্রি’ বিশ্লেষণ করা হয়। এই সম্মিলিত তথ্যে দেখা গেছে:

যেকোনো ধরনের স্ট্রোকের ঝুঁকি কমার অনুপাত: ০.৭৫

ইস্কেমিক স্ট্রোকের ঝুঁকি কমার অনুপাত: ০.৭২

কার্ডিওএমবোলিক স্ট্রোকের ঝুঁকি কমার অনুপাত: ০.৫৫

আলঝেইমার্স রোগের ঝুঁকি কমার অনুপাত: ০.৫১

অর্থাৎ, তথ্য মেলানোর পর এই ওষুধগুলোর প্রভাব মস্তিষ্কের রক্তনালী ও স্নায়ুতন্ত্রকে সুরক্ষিত রাখার ক্ষেত্রে বিশেষ সম্ভাবনার রূপ নিয়েছে।

তাহলে কি এখনই স্ট্রোক বা আলঝেইমার্স রোধে এই ওষুধ খাওয়া যাবে?
উত্তর হলো—না, এখনই নয়।
গবেষকরা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন, এই গবেষণাটি কেবল জিনগত সম্ভাব্য সুরক্ষার একটি ইঙ্গিত দেয়। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কেবল ব্রেন স্ট্রোক বা আলঝেইমার্স প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে এই ওষুধ শুরু করা বা বর্তমান চিকিৎসায় পরিবর্তন আনা একেবারেই উচিত হবে না। জিনের ওপর ভিত্তিক পরীক্ষা আর বাস্তব জীবনে কোনো ওষুধের কার্যকারিতার মধ্যে বেশ ফারাক থাকে।

বিজ্ঞানীদের মতে, জিএলপি-১ ওষুধ সত্য়ায়িত উপায়ে আলঝেইমার্স বা স্ট্রোক কমাতে পারে কি না, কোন ধরনের রোগীরা এতে সর্বাধিক উপকৃত হবেন এবং এর পেছনে আসল জৈবিক প্রক্রিয়া কী—তা পুরোপুরি নিশ্চিত হতে আরও বিস্তৃত ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল ও প্রমান্য গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।

Saheli Saha
  • Saheli Saha

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *