ভাত খাওয়ার আগে এই একটা জিনিস খেলেই ব্লাড সুগার থাকবে একেবারে নিয়ন্ত্রণে! নতুন গবেষণায় ফাঁস হল চাঞ্চল্যকর তথ্য

ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখতে শুধু কি খাচ্ছেন সেটাই কি সব? নাকি কোন খাবারটি আগে খাচ্ছেন, তার ওপরও অনেক কিছু নির্ভর করে? সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, কার্বোহাইড্রেটের আগে ফ্যাট বা চর্বি জাতীয় খাবার খেলে খাওয়ার পর রক্তে শর্করার মাত্রা হুট করে বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা অনেকটাই কমে যায়। মেটাবলিক বা বিপাকীয় স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে কেন খাবারের এই ক্রম বা সিকোয়েন্স এত গুরুত্বপূর্ণ, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মনে দীর্ঘদিন ধরেই কৌতূহল ছিল। এর আগের বিভিন্ন ক্লিনিক্যাল গবেষণাতেও ইঙ্গিত মিলেছিল যে, কার্বোহাইড্রেট খাওয়ার আগে শাকসবজি, প্রোটিন বা ফ্যাট খেলে সুগার স্পাইকের তীব্রতা কমানো সম্ভব। তবে ঠিক কী কারণে বা শরীরের ভেতরে কোন প্রক্রিয়ায় এই সুফল মিলছে, তা এতদিন পরিষ্কার ছিল না।
আন্তর্জাতিক এক গবেষক দল এই গোটা বিষয়ের নেপথ্যে থাকা জৈবিক কারণগুলো খতিয়ে দেখেছেন। ফ্যাট খাওয়ার সঠিক সময় কীভাবে রক্তের গ্লুকোজ, হজম প্রক্রিয়া এবং বিপাক নিয়ন্ত্রণকারী হরমোনগুলোকে প্রভাবিত করে, মূলত সেটাই ছিল তাদের গবেষণার মূল লক্ষ্য। তবে এই গবেষণাটি করা হয়েছে ইঁদুরের ওপর, ফলে এর ফলাফল এখনই সরাসরি মানুষের ক্ষেত্রে হুবহু প্রযোজ্য নয়।
খাবারের ক্রম কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখার ক্ষেত্রে খাওয়ার ঠিক পরের ব্লাড সুগার লেভেল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়। কার্বোহাইড্রেট সমৃদ্ধ খাবার খাওয়ার পর তা হজম হয়ে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা দ্রুত বাড়িয়ে দেয়। বিজ্ঞানীরা তাই এমন একটা কৌশল খুঁজছিলেন, যেখানে খাবার বাদ না দিয়ে বরং কোন খাবারটি আগে খাওয়া উচিত, সেই ধারাটাই একটু বদলে ফেলা যায়।
কিউটো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক এবং এই গবেষণার অন্যতম প্রধান লেখক দাইসুকে ইাবে বলছেন, খাবার খাওয়ার এই ক্রম বদলানোর পদ্ধতিটি বেশ আকর্ষণীয়। কারণ এর জন্য মানুষকে তাদের পছন্দের কোনো খাবারের গ্রুপ পুরোপুরি বাদ দিতে হয় না, কেবল খাওয়ার নিয়মে সামান্য বদল আনতে হয়। বিজ্ঞানীরা এর আগে ধারণা করেছিলেন যে, কার্বোহাইড্রেটের আগে নির্দিষ্ট কিছু খাবার খেলে পাকস্থলী থেকে খাবার বের হওয়ার গতি ধীর হয়ে যায়। এছাড়া এটি জিএলপি-১ (GLP-1)-এর মতো হরমোনগুলোকে উদ্দীপ্ত করতে পারে, যা ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণে দারুণ ভূমিকা রাখে। নতুন এই গবেষণায় এই হরমোনগুলোর সঙ্গে স্নায়ুতন্ত্রের পারস্পরিক যোগাযোগ আরও গভীরভাবে খতিয়ে দেখা হয়েছে।
গবেষকরা ঠিক কী পরীক্ষা করেছেন?
পরীক্ষার জন্য গবেষকরা প্রথমে সারা রাত উপোস করিয়ে রাখা ইঁদুরগুলোকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করেন। একদলকে প্রথমে জল এবং পরে গ্লুকোজ দেওয়া হয়। অন্য দলগুলোকে জলপাইয়ের তেল এবং গ্লুকোজ দেওয়া হয় বিভিন্ন সময়ের ব্যবধানে। এরপর বিজ্ঞানীরা রক্তে গ্লুকোজ, ইনসুলিন, গ্লুকাগন, জিআইপি এবং জিএলপি-১-এর মতো বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ মার্কার বা নির্দেশক পরিমাপ করেন। পাশাপাশি পাকস্থলী থেকে খাবার কতটা দ্রুত অন্ত্রে গিয়ে পৌঁছাচ্ছে, তাও পরীক্ষা করে দেখা হয়।
গবেষকদের অন্য দলগুলো টাইপ ২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ইঁদুর এবং জিএলপি-১ রিসেপ্টর নেই এমন ইঁদুরদের ওপরও এই একই পরীক্ষা চালিয়েছেন। হরমোনের বিভিন্ন সিগন্যাল ব্লক করে এবং ভেগাস স্নায়ুর ভূমিকা খতিয়ে দেখতেও আরও কিছু পরীক্ষা করা হয়। জলপাইয়ের তেল ছাড়া অন্য কোনো খাদ্যের ফ্যাট এই একই ফল দেয় কি না, তা যাচাইয়ের জন্যও পরীক্ষা চালানো হয়েছে।
ফ্যাট আগে খেলেই বদলে যায় সুগার রেসপন্স
গবেষকরা দেখেছেন যে, গ্লুকোজ খাওয়ানোর আগে ইঁদুরগুলোকে জলপাইয়ের তেল দিলে খাওয়ার ঠিক পরপর রক্তে শর্করার মাত্রা কম বাড়ে। গ্লুকোজের আগে ফ্যাট দেওয়ার ফলে পাকস্থলী থেকে খাবার খালি হওয়ার গতিও ধীর হয়ে যায়। এর মানে হলো, গ্লুকোজ হঠাৎ করে একসঙ্গে অন্ত্রে না গিয়ে ধীরে ধীরে সেখানে পৌঁছায়।
কার্বোহাইড্রেটের আগে ফ্যাট খাওয়ার ফলে গ্লুকাগন, জিআইপি এবং জিএলপি-১—এই তিনটি হরমোনের ক্ষরণও খুব দ্রুত বেড়ে যায়। টাইপ ২ ডায়াবেটিস এবং চরম ইনসুলিন ঘাটতিতে ভোগা ইঁদুরদের ক্ষেত্রেও একই ফলাফল দেখা গেছে।
গ্লুকাগনের অবাক করা ভূমিকা
এই গবেষণার সবচেয়ে কৌতূহলউদ্দীপক বিষয়গুলোর একটি হলো গ্লুকাগন হরমোনের ভূমিকা। সাধারণত রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়ানোর জন্যই এই হরমোনটি বেশি পরিচিত। তবে পরীক্ষায় দেখা গেছে, ফ্যাট খাওয়ার পর সুগার কমানোর প্রক্রিয়ার পেছনেও গ্লুকাগনের হাত থাকতে পারে।
গবেষকরা একা গ্লুকাগন সিগন্যালিং বা একা জিএলপি-১ সিগন্যালিং ব্লক করে দেখেছেন যে জলপাইয়ের তেলের সুগার কমানোর ক্ষমতা পুরোপুরি নষ্ট হয় না। তবে যখন এই দুটি পথকেই একসঙ্গে বন্ধ করে দেওয়া হয়, তখন সেই সুফল পাওয়ার হার কমে যায়। এর থেকে বোঝা যায় যে, পুষ্টি উপাদান খাওয়ার সঠিক ক্রমের ক্ষেত্রে এই দুটি হরমোন সিস্টেম একে অপরের সঙ্গে হাত মিলিয়ে কাজ করে।
ভেগাস স্নায়ুকে নিয়ে করা পরীক্ষাও ইঙ্গিত দেয় যে, অন্ত্র এবং স্নায়ুতন্ত্রের মধ্যকার যোগাযোগ এই গোটা প্রক্রিয়ায় বড় ভূমিকা পালন করে। দাইসুকে ইাবে বলেন, তাদের এই গবেষণার ফলাফল থেকে স্পষ্ট যে, পুষ্টি উপাদানগুলো কোন অর্ডারে অন্ত্রে পৌঁছাচ্ছে, তা হরমোন ও স্নায়ুর এক দারুণ সমন্বিত প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। আর এটিই নির্ধারণ করে দেয় পাকস্থলী কতটা দ্রুত অন্ত্রে গ্লুকোজ সরবরাহ করবে।