স্কেচ পেনের মতো দরজা, রিমুভেবল স্পিকার রেডিয়ো! মাত্র ১ টনের কম ওজনের এই ইভি কি পাল্টে দেবে বাজারের সমীকরণ?

দীর্ঘ ৭৮ বছর আগে ১৯৪৮ সালের প্যারিস মোটর শো-তে আত্মপ্রকাশ করে অটোমোবাইল দুনিয়ায় ইতিহাস সৃষ্টি করেছিল ফরাসি সংস্থা সিট্রোয়েনের (Citroën) বিখ্যাত গাড়ি 2CV। সময়ের সঙ্গে সেই নাম অতীত হলেও, বর্তমান যুগের আধুনিক প্রযুক্তি ও পরিবেশবান্ধব ভাবনার হাত ধরে ফের সেই আইকনিক রূপকে ফিরিয়ে আনল সংস্থাটি। ২০২৬ সালের প্যারিস মোটর শো-তে আত্মপ্রকাশ করল সম্পূর্ণ নতুন Citroen 2CV Concept! পুরোনো নস্ট্যালজিয়াকে বজায় রেখে সম্পূর্ণ নতুন স্টাইলিং, অফুরান কৌতূহল জাগানো কেবিন এবং অল-ইলেকট্রিক পাওয়ারট্রেনের মিশেলে তৈরি এই গাড়িটি ইতিমধ্যেই বিশ্বজুড়ে গাড়িপ্রেমীদের নজর কেড়েছে।
২০২৮ সালে আসছে প্রোডাকশন ভার্সন:
সিট্রোয়েন সূত্রে খবর, এই নতুন কনসেপ্টটি কেবল তাদের ঐতিহাসিক মডেলের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলিই নয়, বরং ভবিষ্যতে সংস্থার এন্ট্রি-লেভেল ইলেকট্রিক হ্যাচব্যাকের একটি পরিষ্কার ঝলক। ২০২৮ সালের মধ্যে এই গাড়ির কমার্শিয়াল বা প্রোডাকশন ভার্সন বাজারে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। বিশ্ব বাজারে এর দাম প্রায় ১৫,০০০ ইউরো (₹১৫,০০০) রাখার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সংস্থাটি, যা একে সাশ্রয়ী মূল্যের অন্যতম সেরা ইলেকট্রিক গাড়ি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে। অ্যামি (Ami) এবং সি৩ (C3)-এর ঠিক মাঝখানে জায়গা নেবে এই নতুন ইভি।
নকশা ও বাহ্যিক রূপ:
নতুন 2CV কনসেপ্টটির দৈর্ঘ্য ৩.৭৬ মিটার, যা এর আদি সংস্করণের চেয়ে কিছুটা ছোট। গাড়ির ওজন ১,০০০ কেজির নিচে রাখার পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী ব্যাটারি প্যাক ব্যবহার করেও শহরের দৈনন্দিন চলাচলের জন্য যথেষ্ট রেঞ্জ বা মাইলেজ পাওয়া যায়।
গাড়ির সামনের অংশে গোল আকৃতির এলইডি হেডলাইটের সঙ্গে রয়েছে সেমি-সায়রকুলার ডিআরএল এবং সিট্রোয়েনের পরিচিত ডাবল-শেভন লোগো। মূল গাড়ির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে হুডের ওপর রাখা হয়েছে ভি-আকৃতির ডিজাইন ও মোটা সিলভার স্ট্রিপ। এছাড়া উইন্ডস্ক্রিনের ওপর খোদাই করা রয়েছে ‘৪৮’, ‘৯০’ ও ‘২৬’ সংখ্যাগুলি, যা যথাক্রমে ১৯৪৮ (আদি গাড়ির আত্মপ্রকাশ), ১৯৯০ (উৎপাদন বন্ধ) এবং ২০২৬ (নতুন কনসেপ্টের আত্মপ্রকাশ)—এই তিনটি ঐতিহাসিক বছরকে নির্দেশ করে। পিছনে রয়েছে মার্জিত টেলগেট, স্লিম এলইডি টেল ল্যাম্প এবং পুরোনো ঐতিহ্যবাহী নিদর্শনের ছোঁয়া। এছাড়া এর ১৮ ইঞ্চির স্টিল হুইলে মিশেলিন (Michelin)-এর বিশেষ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে, যা ক্রমাগত টায়ার মনিটর করতে সক্ষম।
অপ্রচলিত কেবিন ও আকর্ষণীয় ফিচার:
গাড়ির ভেতরের অন্দরমহল ডিজাইন করা হয়েছে অত্যন্ত ন্যূনতম অথচ আকর্ষণীয় উপায়ে। কেবিনের ভেতরে সাদা এবং হলুদের এক দারুণ কম্বিনেশন দেখা যায়। ফ্লোরিং ও দরজায় রয়েছে ঐতিহ্যবাহী ক্যান বাস্কেট থেকে অনুপ্রাণিত বিশেষ টেক্সচারযুক্ত ফ্যাব্রিক। বসার জন্য সাধারণ সিটের বদলে রয়েছে হলুদ টারটান ফ্যাব্রিকের বেঞ্চ-স্টাইল সিট।
সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হলো, এই গাড়িতে কোনো প্রথাগত ড্যাশবোর্ড নেই! তার বদলে সামনে রয়েছে একটি সিলিন্ড্রিক্যাল স্ট্রাকচার, যার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে সিঙ্গেল-স্পোক স্টিয়ারিং হুইল এবং একটি ৮ ইঞ্চির টাচস্ক্রিন ইনফোটেইনমেন্ট ডিসপ্লে। কমিক বুক থেকে অনুপ্রাণিত এর গ্রাফিক্স বেশ নজরকাড়া। কেবিনকে আরও হালকা ও ছিমছাম রাখতে দরজা খোলার জন্য ট্রেডিশনাল হ্যান্ডেলের বদলে রাখা হয়েছে ফ্যাব্রিক স্ট্র্যাপ। এছাড়া রয়েছে একটি রিমুভেবল বা খুলে নেওয়া যায় এমন পোর্টেবল স্পিকার, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘Radioen’। এমনকি অ্যাক্সিলেটর পেডালে খরগোশ এবং ব্রেক পেডালে কচ্ছপের প্রতীক এঁকে এক মজার ও ছকভাঙা ছোঁয়া রাখা হয়েছে।
ব্যাটারি ও প্রত্যাশিত দাম:
সিট্রোয়েনের পক্ষ থেকে এখনও ব্যাটারি ক্যাপাসিটি, মোটরের ক্ষমতা বা এক্সাক্ট ড্রাইভিং রেঞ্জের মতো টেকনিক্যাল ডিটেইলস পুরোপুরি প্রকাশ করা হয়নি। তবে গাড়ির ওজন এক টনের নিচে রাখার মাধ্যমে একে সাশ্রয়ী ও কার্যকরী করে তোলাই সংস্থার মূল লক্ষ্য। ২০২৮ সালে বাজারে আসার পর পকেট-ফ্রেন্ডলি এই ইলেকট্রিক কার বর্তমান প্রজন্মের ক্রেতাদের মাঝে কতটা ঝড় তোলে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।