অফিস আওয়ার্সের পরেও কি আপনি কাজের জালে বন্দি? মেন্টাল হেলথ ডে-তে সামনে এল ভয়ঙ্কর তথ্য

ল্যাপটপ বন্ধ, অফিস টাইমও অফিশিয়ালি শেষ। কিন্তু আধুনিক কর্পোরেট জীবনে অনেক কর্মীর কাছেই আসল কাজের রুটিন শুরু হয় হাতের ছোট স্ক্রিনটিতে। রাতের খাবারে বসে বা ঘুমাতে যাওয়ার ঠিক আগে বসের একটি হোয়াটসঅ্যাপ নোটিফিকেশন অথবা ইমেল নিমেষেই আপনাকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় সেই কাজের দুনিয়ায়। প্রযুক্তির উন্নতি কর্মক্ষেত্রে যোগাযোগ সহজ করলেও, কাজ আর ব্যক্তিগত জীবনের সীমারেখা মুছে দেওয়া নিয়ে তৈরি হয়েছে বড় প্রশ্ন। বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস ২০২৬-এর প্রেক্ষাপটে এই সমস্যাটিকে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

অফিসের বাইরেও কাজ চালিয়ে যাওয়ার মানসিক চাপ:
নিউ দিল্লির পিএসআরআই হাসপাতালের কনসালট্যান্ট সাইকিয়াট্রিস্ট ডা. পরমজিৎ সিং নিউজ নাইন ডিজিটাল-কে দেওয়া এক এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে জানান, “আজকের দিনে অনেক কর্মীর জন্যই কাজের দিনটি অফিস ছাড়ার সঙ্গে শেষ হয় না। ম্যানেজারের একটি হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজ, জরুরি ইমেল বা ওয়ার্ক-গ্রুপের নোটিফিকেশন প্রফেশনাল দায়িত্বগুলোকে সরাসরি ব্যক্তিগত সময়ে টেনে নিয়ে আসে।” তিনি আরও যোগ করেন, কোনো সত্যিকারের জরুরি পরিস্থিতি না থাকা সত্ত্বেও কর্মচারীরা যখন নিজেদের সবসময় ‘উপলব্ধ’ বা এভেলেবল রাখতে বাধ্য হন, তখনই শুরু হয় আসল সমস্যা।

মানসিক শান্তি ও পুনরুদ্ধারের সুযোগ কমছে:
রাতের বেলা কোনো মেসেজের উত্তর না দিলেও, কেবল একটি কাজের নোটিফিকেশন দেখতে পাওয়াটাই ব্রেনকে আবার অসমাপ্ত কাজ বা ডেডলাইনের কথা মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। ডা. সিংয়ের মতে, “কাজের জগত থেকে মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন হতে না পারা দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপের সৃষ্টি করে। অথচ কাজের বাইরের সময়টুকু মস্তিষ্ক এবং শরীরের পুনরুদ্ধারের জন্য অত্যন্ত জরুরি। ব্যক্তিগত সময়, ঘুম, পরিবারকে সময় দেওয়া, ব্যায়াম বা অবসর—এসবই মানুষের মনকে কাজের চাপ থেকে মুক্ত করতে সাহায্য করে। কিন্তু সারা সন্ধ্যা জুড়ে কাজের চিন্তা মাথায় ঘুরলে সেই রিকভারি পিরিয়ড ছোট হয়ে যায়।”

দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ও সতর্কতা:
দীর্ঘদিন ধরে এই ‘অলওয়েজ অন’ বা সবসময় কাজের মধ্যে থাকার অভ্যাস চললে কর্মীরা বিরক্তি, মনোযোগের অভাব, ঘুমের সমস্যা, মানসিক ক্লান্তি এবং কাজের প্রতি অনীহার মতো উপসর্গের শিকার হতে পারেন। তবে এটিকে সরাসরি বার্নআউট না বললেও, এটি একটি স্পষ্ট সংকেত যে বর্তমান কাজের ধরণটি অস্বাস্থ্যকর হয়ে উঠছে।

সমাধান কী? কীভাবে রক্ষা করবেন ব্যক্তিগত সময়:
বিশেষজ্ঞদের মতে, এর জন্য পেশাগত দায়িত্ব অবহেলা না করেও কিছু সহজ উপায়ে ব্যক্তিগত সময় রক্ষা করা সম্ভব। যেমন— কাজের সময় শেষ হওয়ার পর জরুরি নয় এমন নোটিফিকেশন মিউট করে রাখা এবং সহকর্মীদের স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া যে কখন আপনি উপলব্ধ থাকবেন। একই সঙ্গে ম্যানেজারদেরও এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা উচিত যেখানে প্রতিটি মেসেজের সঙ্গে সঙ্গে উত্তরের প্রত্যাশা করে পুরো টিমের ওপর মানসিক চাপ বাড়িয়ে দেওয়া হয় না। তবে হ্যাঁ, স্বাস্থ্যসেবা, জরুরি পরিষেবা বা নির্দিষ্ট কিছু সিনিয়র রোলের ক্ষেত্রে কাজের প্রকৃতির কারণে ২৪ ঘণ্টা উপলব্ধ থাকাটা আবশ্যক হতে পারে।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি অফিস আওয়ার্সের পরের একটি বার্তার নয়, বরং কাজের কোনো প্রকৃত জরুরি প্রয়োজনীয়তা ছাড়াই সার্বক্ষণিক উপলব্ধ থাকার মানসিক চাপ তৈরি হওয়াই আসল সমস্যা। জীবনের ভারসাম্য বজায় রাখতে এবং মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখতে এই অদৃশ্য দেয়ালগুলো তুলে দেওয়া এখন সময়ের দাবি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *