স্বর্গে সোনা-হিরে পেলেও কেন খেতে পাননি খাবার? মহালয়ার তর্পণের সঙ্গে মহাভারতের কর্ণের আশ্চর্য কাহিনি!

পিতৃপক্ষের অবসান আর দেবীপক্ষের সূচনা—এই দুইয়ের মাহেন্দ্রক্ষণেই উপস্থিত হয় মহালয়া। বাঙালির জীবনে এই বিশেষ দিনটির গুরুত্ব ও আবেগ অপরিসীম। ভোরের নিস্তব্ধতা ভেঙে রেডিওতে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠে বেজে ওঠে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’, আর চারদিকে শুরু হয় দেবী দুর্গার আগমনী আবহ। তবে কেবল দুর্গাপুজোর আনন্দই নয়, প্রয়াত পূর্বপুরুষদের শ্রদ্ধা জানানোর সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে মহালয়া। এই দিনে নদীঘাটে তর্পণ ও পিণ্ডদানের হিড়িক দেখা যায়। কিন্তু জানেন কি, মহালয়ার এই তর্পণ রীতির পেছনে লুকিয়ে রয়েছে মহাভারতের বীর যোদ্ধা কর্ণের এক বিস্ময়কর কাহিনি?
‘মহালয়া’ শব্দের আসল অর্থ কী?
‘মহালয়া’ শব্দটিকে কেন্দ্র করে নানা পৌরাণিক ব্যাখ্যা রয়েছে। একটি প্রচলিত মত অনুযায়ী, ‘মহা’ এবং ‘আলয়’—এই দুই শব্দের মিলনে তৈরি ‘মহালয়া’, যার অর্থ মহৎ আবাস বা পরম আশ্রয়। আবার লোকবিশ্বাসে এই দিনটিকে স্বলোক ও পরলোকের সংযোগস্থল হিসেবেও গণ্য করা হয়। পৌরাণিক রীতি অনুযায়ী, পিতৃপক্ষের শেষ দিনে পূর্বপুরুষদের স্মরণে অন্ন ও জল নিবেদন করা হয়। আবার একই দিনে অন্ধকার পেরিয়ে আলোর প্রতীক হিসেবে দেবীপক্ষের সূচনা ঘটে, যা উৎসবের প্রতীক্ষাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
মহাভারতের কর্ণ ও মহালয়ার লোকগাথা:
মহালয়াকে ঘিরে একাধিক পৌরাণিক আখ্যানের মধ্যে মহাভারতের দানবীর কর্ণের গল্পটি অন্যতম চর্চিত। প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে বীরগতির পর কর্ণ যখন স্বর্গে পৌঁছান, তখন তাঁকে আহার হিসেবে খাদ্যদ্রব্যের বদলে সোনা, রূপো ও মূল্যবান রত্ন পরিবেশন করা হতে থাকে।
ক্ষুধার্ত ও বিস্মিত কর্ণ দেবরাজ ইন্দ্রকে এর কারণ জিজ্ঞাসা করলে ইন্দ্র জানান, জীবদ্দশায় কর্ণ অপরিসীম সোনা ও রত্ন দান করলেও নিজের পূর্বপুরুষদের উদ্দেশে কখনও খাদ্য বা জল দান করেননি। তাই স্বর্গেও তাঁকে খাবারের পরিবর্তে ধনরত্ন দেওয়া হচ্ছে।
কেন মর্ত্যে ফিরে এসেছিলেন দানবীর কর্ণ?
ইন্দ্রের কথা শুনে কর্ণ জানান, তিনি নিজের প্রকৃত কুল পরিচয়ের বিষয়ে অজ্ঞাত ছিলেন, তাই পূর্বপুরুষদের উদ্দেশে পিণ্ডদান করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি। বিষয়টি অনুধাবন করে দেবরাজ ইন্দ্র কর্ণকে ১৬ দিনের জন্য পুনরায় মর্ত্যে ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেন। মর্ত্যে এসে কর্ণ তাঁর পিতৃপুরুষদের স্মরণে খাদ্য ও জল দান করেন এবং শ্রদ্ধা জানান। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, মর্ত্যে কর্ণের সেই ১৬ দিনের দান-ধ্যানের স্মৃতি থেকেই পিতৃপক্ষে তর্পণ ও পিণ্ডদানের সংস্কৃতি ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
মহালয়ার গভীর সামাজিক ও আধ্যাত্মিক তাৎপর্য:
যদিও কর্ণের এই কাহিনিটি মূলত একটি জনপ্রিয় পৌরাণিক লোকগাথা, যা মহাভারতের মূল পাঠের থেকে কিছুটা আলাদা, তবুও এর অন্তর্নিহিত বার্তা অপরিসীম। মহালয়া কেবল দেবী দুর্গার আগমনী বার্তা দেয় না, বরং তা অতীত ও বর্তমানের এক অপূর্ব মানবিক সেতুবন্ধন। পিতৃপুরুষের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো এবং পারিবারিক শেকড়কে স্মরণ করার মাধ্যম হিসেবে এই দিনটির তাৎপর্য অনন্য। স্মৃতি, ভক্তি এবং উৎসবের এই মেলবন্ধনই মহালয়াকে বাঙালির হৃদয়ে চিরস্থায়ী আসন দিয়েছে।