সিনেমা নয়, সোজা কার্গিলের রণক্ষেত্রে! ৭৬ থেকে ওজন নেমেছিল ৫৬ কেজি— গোপন রাখলেন নানা পাটেকর

বক্স অফিসের সাফল্যের আলো ছাড়িয়ে নানা পাটেকরের জীবনের এমন একটি অধ্যায় রয়েছে, যা খুব কম মানুষই জানেন। সিনেমা জগতের পরিচিত বলয় থেকে এক লাফে সরাসরি কার্গিলের যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়ে সোলজারদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন এই অভিনেতা।
সেনাবাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগের সূত্রপাত
সেনাবাহিনীর প্রতি নানা পাটেকরের এই টান আজকের নয়। এর সূত্রপাত হয়েছিল ১৯৯১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত তাঁর বিখ্যাত ছবি ‘প্রহর: দ্য ফাইনাল অ্যাটাক’ (Prahaar: The Final Attack)-এর সময় থেকে। ছবিতে একজন সেনা অফিসারের চরিত্রে নিখুঁত অভিনয় করার জন্য মরাঠা লাইট ইনফ্যান্ট্রি (Maratha Light Infantry)-র সঙ্গে দীর্ঘ প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন তিনি। জানা যায়, তিনি প্রায় তিন বছর এই সামরিক ইউনিটের সঙ্গে কাটিয়েছিলেন। মিলিটারি ড্রিল, অস্ত্র চালনা এবং কঠিন যুদ্ধক্ষেত্রের পরিবেশ সম্পর্কে গভীর অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন তিনি। আর সেই কঠোর প্রশিক্ষণই পরবর্তীতে ১৯৯৯ সালে কার্গিল যুদ্ধের সময় দারুণ কাজে লেগেছিল।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর অনুমতি ও যুদ্ধযাত্রা
দূর থেকে কেবল মুখের কথায় সেনা জওয়ানদের সমর্থন জানানোর পাত্র ছিলেন না নানা পাটেকর। কার্গিল যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তিনি সেনার উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং সরাসরি যুদ্ধে বা জওয়ানদের সহায়তায় যোগ দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। প্রথমে তাঁর এই প্রস্তাব খারিজ করে বলা হয় যে এর জন্য দেশের প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর বিশেষ অনুমতি প্রয়োজন।
এরপর তিনি তৎকালীন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী জর্জ ফার্নান্ডেজের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ‘কৌন বনেগা ক্রোড়পতি’ (KBC)-র মঞ্চে পুরনো সেই স্মৃতির কথা বলতে গিয়ে নানা জানিয়েছিলেন, তিনি মন্ত্রীকে বলেছিলেন—সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছ’মাস সময় নিলেও তিনি ইতিমধ্যেই মরাঠা লাইট ইনফ্যান্ট্রির সঙ্গে তিন বছর ধরে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। তাঁর এই সামরিক ব্যাকগ্রাউন্ডের কথা শোনার পরেই জর্জ ফার্নান্ডেজ তাঁকে যাওয়ার অনুমতি দেন। এরপরই সোজা যুদ্ধক্ষেত্রে পাড়ি দেন অভিনেতা এবং কার্গিল যুদ্ধের সময় সেনার সঙ্গে বেশ কিছুটা সময় কাটান।
কিউআরটি-র অংশ ও হাসপাতালের সেবা
যুদ্ধক্ষেত্রে তাঁর এই পোস্টিং কয়েক সপ্তাহ থেকে প্রায় দু’মাস পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিল। তিনি দ্রাস, লেহ, বারামুল্লা এবং সোপোরসহ একাধিক সংবেদনশীল এলাকায় ঘুরেছিলেন এবং পরবর্তীতে কুইক রেসপন্স টিম (QRT)-এর একটি অংশ হয়ে ওঠেন। তবে জওয়ানদের সঙ্গে কাটানো সেই সময়ে তিনি ঠিক কী কী করেছিলেন, সেই অপারেশনাল বিশদে কখনওই যাননি অভিনেতা। এক সাক্ষাৎকারে তিনি কেবল জানিয়েছিলেন যে তিনি একটি কিউআরটি-র অংশ হওয়ার পাশাপাশি মিলিটারি হাসপাতালেও আহত জওয়ানদের সেবায় সাহায্য করেছিলেন।
তবে এই অভিজ্ঞতার জন্য তাঁকে বেশ বড় শারীরিক মূল্যও দিতে হয়েছিল। শ্রীনগরে পৌঁছানোর সময় তাঁর ওজন যেখানে প্রায় ৭৬ কেজি ছিল, সেখান থেকে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরে আসার সময় তাঁর ওজন কমে দাঁড়ায় মাত্র ৫৬ কেজিতে! জওয়ানদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করার সেই চরম কঠিন পরিস্থিতির জন্যই তাঁর এই শারীরিক বদল ঘটেছিল।
প্রচারের আলো থেকে দূরে প্রকৃত দেশসেবা
সবচেয়ে বড় কথা, নানা পাটেকর কখনওই নিজের এই দেশসেবাকে কোনও বড় কৃতিত্ব বা প্রচারের আলোয় নিয়ে আসেননি। কার্গিলে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে একবার তাঁকে প্রশ্ন করা হলে তিনি অত্যন্ত সহজ ও বিনয়ী ভাষায় উত্তর দিয়েছিলেন, “এইটুকু তো করতেই পারি দেশের জন্য।”
পর্দায় একাধিকবার দেশাত্মবোধক ও সেনা অফিসারের চরিত্রে অভিনয় করলেও নানা পাটেকর কখনওই নিজের এই কার্গিল অভিজ্ঞতাকে প্রচারের হাতিয়ার বা নিজের পাবলিক ব্যক্তিত্বের অংশ করেননি। এত বড় মাপের একজন অভিনেতা হওয়া সত্ত্বেও যুদ্ধক্ষেত্রের সেই দিনগুলো নিয়ে তিনি খুব কমই মুখ খুলেছেন এবং সবসময় নিজের অবদানকে ছোট করেই দেখেছেন। সিলভার স্ক্রিনের কাল্পনিক যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে ১৯৯৯ সালে বাস্তবের কঠিন মাটিতে দাঁড়িয়ে আসল জওয়ানদের পাশে থাকার এই ইতিহাস নানা পাটেকরকে এক চিরকালীন প্রকৃত নায়কের আসনেই বসিয়েছে।