“জব ছোড় চলে আর্জেন্টিনা নগরী…!” চোখের জলে নীল-সাদা জার্সি ছাড়লেন মেসি, কাঁদলো পুরো বিশ্ব

১৮৫৬ সালে লখনউ ছাড়ার সময় অশ্রুসজল চোখে শেষ কবিতা লিখেছিলেন নবাব ওয়াজেদ আলি শাহ—“জব ছোড় চলে লখনৌ নগরী…”! আজকের পর থেকে সেই বিখ্যাত পঙক্তিটিকে খানিকটা বদলে যদি বলা হয়, “জব ছোড় চলে আর্জেন্টিনা নগরী…”—তবে বিন্দুমাত্র ভুল হবে না। আজ ভারতীয় সময় ভোরে বিশ্ব ফুটবলের রাজপুত্র লিওনেল মেসিকে শেষবারের মতো আর্জেন্টিনার ঐতিহ্যবাহী নীল-সাদা জার্সিতে দেখে নিলেন কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমী। আর তিনি আসবেন না, আর কোনোদিন বিশ্বকে মন্ত্রমুগ্ধ করবে না সেই বাঁ পায়ের চেনা জাদু।

জাতীয় দলের জার্সিতে নিজের শেষ ম্যাচে বেনিনের বিরুদ্ধে মাঠে নেমেছিলেন মেসি। সেখানে গোল করলেন, সতীর্থদের দিয়ে গোল করালেন, নিজে কাঁদলেন এবং কাঁদালেন গোটা ফুটবল বিশ্বের সমর্থকদের।

চোখের জলে জাতীয় সঙ্গীত, বিদায়ে পরিবার ও ১০ নম্বর রাজকীয় স্মারক
সবাই জানত, এই বেদনার দিনটি একদিন না একদিন আসবেই। সব ঐশ্বর্য ও রাজ্যপাট ছেড়ে রাজাকে একদিন বিদায় নিতেই হয়। তিন পাতার এক আবেগঘন চিঠিতে নিজের প্রয়াণ ও মানসিকভাবে জর্জরিত হওয়ার কথা আগে জানিয়েছিলেন মেসি—যেখানে ছিল বিশ্বকাপ ফাইনালের হার থেকে শুরু করে বাবার মৃত্যুর গভীর ক্ষত।

আজ ম্যাচের শুরুতে আর্জেন্টিনার জাতীয় সঙ্গীত যখন বাজছিল, তখন নিজেকে আর ধরে রাখতে পারেননি মেসি; হাউহাউ করে কেঁদে ফেলেন তিনি। সেই কান্না ছড়িয়ে পড়েছিল বিশ্বজুড়ে থাকা তাঁর কোটি কোটি ভক্তদের চোখেও।

বিদায়ী এই ম্যাচের জন্য বিশেষ নকশার নীল-সাদা জার্সিতে সোনালী রঙের স্পর্শ দেওয়া হয়েছিল। গ্যালারিতে টাঙানো হয় ১০ নম্বর লেখা বিশাল এক সোনালী স্মারক জার্সি। মাঠে মেসি যখন প্রবেশ করেন, আতশবাজির আলোয় ভেসে যায় চারপাশ। পাশে ছিলেন স্ত্রী আন্তোনেলা ও তিন পুত্র—সিরো, থিয়াগো ও মাতেও। প্রতিপক্ষ হিসেবে আসা বেনিন দলও নাকি ফুটবল রাজপুত্রের এই ঐতিহাসিক বিদায়কে সম্মান জানাতে বিনামূল্যে ম্যাচটি খেলতে রাজি হয়েছিল।

মাঠে জাদুকরী পারফরম্যান্স: গোল, অ্যাসিস্ট এবং ১২৬তম রেকর্ড
ম্যাচের ঠিক ১০ মিনিটের মাথায় ফুটবলের জাদুকরের প্রতি সম্মান জানাতে কয়েক মিনিটের জন্য খেলা স্থগিত রাখা হয়। পুরো স্টেডিয়াম দাঁড়িয়ে ‘স্ট্যান্ডিং ওভেশন’ দেয় লিওকে। প্রথমার্ধ গোলশূন্য থাকলেও, বিরতির পরপরই শুরু হয় আসল চমক।

প্রথম গোল: বিরতির পর মেসির নিখুঁত পাস থেকে গোল করে দলকে এগিয়ে দেন নিকোলাস ওটামেন্ডি (যিনিও আজ শেষবারের মতো আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে চাপান)।

দ্বিতীয় গোল: ৬১ মিনিটের মাথায় আবার মেসির জাদুকরী অ্যাসিস্ট, সেখান থেকে গোল নিশ্চিত করেন নিকো পেজ।

তৃতীয় ও ঐতিহাসিক মুহূর্ত: ৭১ মিনিটের মাথায় পেনাল্টি থেকে দুর্দান্ত গোল করে নিজের বিদায়ী ম্যাচকে স্মরণীয় করে রাখেন মেসি। আর্জেন্টিনা জার্সিতে এটি তাঁর ১২৬তম গোল!

মহীরুহের প্রস্থান: এক যুগের অবসান
আর্জেন্টিনা ৩-০ গোলে ম্যাচ জিতে মাঠ ছাড়লেও ভক্তদের মনের শূন্যতা থেকে গেল অপরিসীম। জীবনে হয়তো অনেক কিছুই চাওয়া যায় বা পাওয়া যায়, কিন্তু ফুটবলপ্রেমীদের পরম কাঙ্ক্ষিত সেই দৃশ্য আর দেখা যাবে না। নীল-সাদা জার্সিতে দেশের পরিত্রাতা হিসেবে আর কোনোদিন বল পায়ে ছুটবেন না লিওনেল মেসি। কোনো দূরহ কোণ থেকে তাঁর সেই বাঁকানো শট আর গোলকিপারকে স্তব্ধ করবে না, আর কমেন্ট্রি বক্স থেকে ভেসে আসবে না—‘আংকারা মেসি’!

মারাদোনা আগেই পাড়ি জমিয়েছিলেন ওপারে, আর আজ বিদায় জানালেন মেসিও। ভবিষ্যতে হয়তো নতুন কোনো তারা আসবে, রেকর্ড ভাঙবে-গড়বে, কিন্তু ফুটবল আকাশে লিওনেল মেসির মতো মহীরুহের স্থান কি আদৌ কখনো অন্য কেউ নিতে পারবে?

Saheli Saha
  • Saheli Saha

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *