“এলন মাস্ক আপনার ভাই!” ধর্ম ও ঈশ্বর নিয়ে কেন এমন মন্তব্য করলেন জাভেদ আখতার?

ধর্ম, ব্যক্তিগত বিশ্বাস এবং নাস্তিকতা নিয়ে নিজের স্পষ্ট ও যুক্তিনির্ভর মতামত জানিয়ে ফের আলোচনায় বলিউডের প্রবীণ লেখক তথা গীতিকার জাভেদ আখতার। সম্প্রতি ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে ঈশ্বরচিন্তা, মহাবিশ্বের নিয়ম এবং কেন মানুষ আজও ধর্মের ওপর নির্ভরশীল—তা নিয়ে নিজের সুচিন্তিত বক্তব্য তুলে ধরেন তিনি।

‘কনটিনজেন্সি’ ও পদার্থের মৌলিক সত্য
সাক্ষাৎকারে জাভেদ আখতারকে ইসলামিক স্কলার মুফতি শামাইল নাদভির সঙ্গে তাঁর অতীতে হওয়া একটি বহুল আলোচিত বিতর্কের কথা মনে করিয়ে দেওয়া হয়। সেই বিতর্কে শামাইল ‘কনটিনজেন্সি’ (বা আকস্মিক নির্ভরতা) শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন। এবার সেই প্রসঙ্গের পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে জাভেদকে জিজ্ঞেস করা হয়, তিনি কি বিষয়টি এখন অনুধাবন করতে পারছেন?

জবাবে জাভেদ আখতার জানান, সব ক্ষেত্রে এই যুক্তি খাটে না। উদাহরণ হিসেবে তিনি আলো ও মাধ্যাকর্ষণের গতিপথের কথা উল্লেখ করে বলেন, বিজ্ঞান ও পদার্থবিদ্যায় কিছু বিষয়কে ‘ব্রুট ফ্যাক্ট’ বা পরম সত্য বলা হয়, যা কোনো শর্ত বা আকস্মিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে না।

“প্রাকৃতিক দুর্যোগে এত মানুষের মৃত্যু কেন?” ধর্ম ও ঈশ্বর নিয়ে প্রশ্ন
বিভিন্ন ধর্মের প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, এক সর্বব্যাপী ও সর্বশক্তিমান সত্তা এই জগৎ পরিচালনা করছেন। তবে জাভেদ আখতারের কাছে এই ধারণাটি সম্পূর্ণ যুক্তিসঙ্গত মনে হয় না।

বন্যা, ভূমিকম্প বা মহামারীর মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানির প্রসঙ্গ টেনে তিনি প্রশ্ন তোলেন, “যাঁরা এই মর্মান্তিক দুর্যোগের শিকার হন, তাঁরা প্রত্যেকেই কি অপরাধী ছিলেন?” তিনি আরও যোগ করেন, যদি সত্যিই কোনো পরম শক্তি থেকে থাকেন, তবে মানবজাতির এত কষ্ট ও অপরাধ ঘটতে দেখেও তিনি কেন তা প্রতিরোধ করেন না?

“যে দেশে সঙ্কট বেশি, সেখানে প্রার্থনার ভিড়ও বেশি”
বিশ্বের সামাজিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে জাভেদ আখতার এক চাঞ্চল্যকর দাবি করেন। তাঁর মতে, বিশ্বের যে দেশগুলির আর্থিক বা সামাজিক অবস্থা সবচেয়ে শোচনীয়, সেখানকার মানুষের মধ্যেই সবচেয়ে বেশি ঈশ্বরনির্ভরতা ও প্রার্থনার প্রবণতা দেখা যায়। পক্ষান্তরে, উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশগুলিতে দোয়ার প্রবণতা তুলনামূলকভাবে অনেকটাই কম।

তাহলে কি মানুষ কেবল বিপদে পড়লেই ধর্মের শরণাপন্ন হয়? জাভেদের স্পষ্ট উত্তর—বিশ্বাস মানুষকে টিকে থাকার আশা দেয়। অনেক সময় সেই আশা কাল্পনিক বা মিথ্যে আশ্রয় হলেও মানুষ তা থেকে মানসিক সান্ত্বনা খুঁজে পায়।

“এলন মাস্ক আপনার ভাই—এটা ভাবলেও শান্তি পাবেন!”
নিজের যুক্তিটি সহজ ভাষায় বোঝাতে গিয়ে ধনকুবের এলন মাস্কের উদাহরণ টানেন জাভেদ। তিনি রসিকতা করে বলেন, “কেউ যদি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে নেন যে এলন মাস্ক তাঁর নিজের ভাই এবং আগামী মাসেই তাঁকে কয়েক বিলিয়ন ডলার পাঠাচ্ছেন, তবে সেই অবাস্তব চিন্তা বা বিশ্বাসও কিন্তু তাঁকে সাময়িক সান্ত্বনা দেবে।” তিনি আরও যোগ করেন, “অন্তত এলন মাস্ক তো একজন বাস্তব মানুষ, তাই এমন বিশ্বাসও কাউকে মানসিক স্বস্তি দিতে পারে!”

নাস্তিকতা ও অন্ধ বিশ্বাসের মূল পার্থক্য
নাস্তিকতার গভীর সংজ্ঞা দিতে গিয়ে জাভেদ আখতার জানান, ধর্মবিশ্বাসী মানুষ সাধারণত পরিবার, কোনো ব্যক্তি বা ধর্মগুরুর সূত্রে প্রাপ্ত ধারণার ওপর অন্ধ ভরসা রাখেন। কিন্তু একজন নাস্তিক কোনো ব্যক্তির কথায় পরিচালিত হন না; তিনি যুক্তি, প্রমাণ ও বিজ্ঞানের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করেন।

তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরে বলেন, বিশ্বের প্রায় ৯৯ শতাংশ মানুষই যে ধর্মে জন্মগ্রহণ করেন, সারাজীবন সেই ধর্মকেই আঁকড়ে কাটিয়ে দেন। এই পরিসংখ্যান থেকেই পরিষ্কার হয়ে যায় যে, মানুষের ধর্মবিশ্বাস কতটা কাকতালীয় এবং পরিবেশনির্ভর।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *