দুর্গাপুরের শিক্ষকদের জন্য হাইকোর্টের ঐতিহাসিক রায়! বন্ধ স্কুলের শিক্ষকদের কোটি টাকার ক্ষতিপূরণের নির্দেশ

দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা আইনি লড়াইয়ে অবশেষে বড় সাফল্য পেলেন দুর্গাপুরের চাকরিহারা শিক্ষকরা। স্টিল প্ল্যান্টের স্কুল বন্ধ হওয়া এবং তার আগে অন্যায়ভাবে শিক্ষক ছাঁটাইয়ের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের মোটা অঙ্কের আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিল কলকাতা হাইকোর্ট (Calcutta High Court)। কেবল ক্ষতিপূরণই নয়, নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে টাকা না মেটালে অতিরিক্ত সুদের টাকা গুনতে হবে দুর্গাপুর স্টিল প্ল্যান্ট (DSP) কর্তৃপক্ষকে।
সাড়ে পাঁচ দশকের ঐতিহ্যবাহী স্কুল বন্ধের জের
ঘটনার সূত্রপাত দুর্গাপুর স্টিল প্ল্যান্টের অধীনে পরিচালিত একাধিক নামজাদা স্কুলকে কেন্দ্র করে। বিগত পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে সংস্থাটি দুর্গাপুর ইস্পাত হাইস্কুল, শিবাজী রোড ডিএসপি বয়েজ হাইস্কুল-সহ একাধিক সিবিএসই (CBSE) ও রাজ্য পর্ষদ অনুমোদিত বিদ্যালয় পরিচালনা করে আসছিল। বাংলা, হিন্দি ও ইংরেজি ভাষায় হাজার হাজার পড়ুয়া সেখানে পড়াশোনা করত। তবে নানান জটিলতায় ২০১৫ সালে স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায় এই ঐতিহাসিক স্কুলগুলি।
স্কুল বন্ধের বেশ কয়েক বছর আগে ২০০৯ সালে এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে পার্শ্বশিক্ষক হিসেবে প্রায় ৪৫ জন শিক্ষককে নিয়োগ করেছিল কর্তৃপক্ষ। দিনে ১৫০ টাকা থেকে শুরু হয়ে পরবর্তীতে ৩০০ টাকা পারিশ্রমিকে শিক্ষকরা দায়িত্ব সামলালেও চাকরির স্থায়ীত্ব মেলেনি। দফায় দফায় অনেককে ছাঁটাই করা হয়।
সিএটি (CAT)-তে পরাজয়, পরবর্তীতে হাইকোর্টে বিরাট কামব্যাক
অন্যায়ভাবে কাজ হারিয়ে ১৬ জন শিক্ষক আইনি লড়াইয়ের পথ বেছে নেন। প্রথমে সেন্ট্রাল অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ট্রাইব্যুনালে (CAT) মামলা দায়ের করা হলেও ২০২৫ সালে ক্যাট তাঁদের আর্জি খারিজ করে দেয়। কিন্তু হাল ছাড়েননি শিক্ষকরা। ক্যাট-এর নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে তাঁরা কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন।
মামলাটির চূড়ান্ত শুনানি শেষে প্রধান বিচারপতি রবীন্দ্র ভি ঘুগে এবং বিচারপতি ওম নারায়ণ রাইয়ের ডিভিশন বেঞ্চ চাকরিহারা শিক্ষকদের পক্ষে ঐতিহাসিক রায় প্রদান করেন।
কী নির্দেশ দিয়েছে কলকাতা হাইকোর্ট?
বার্ষিক ক্ষতিপূরণ: প্রতিটি সংশ্লিষ্ট শিক্ষককে তাঁর কর্মকালের মেয়াদ অনুযায়ী প্রতি বছরের হিসাব ধরে ১.৫ লক্ষ টাকা করে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
৬ শতাংশ সুদ: এই মূল ক্ষতিপূরণের মেয়াদের ওপর অতিরিক্ত ৬ শতাংশ হারে সুদ যোগ করে মোট অঙ্ক মেটাতে হবে।
৪৫ দিনের আল্টিমেটাম: ডিএসপি (DSP) কর্তৃপক্ষকে আগামী ৪৫ দিনের মধ্যে সমস্ত পাওনা মেটানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিলম্বের পেনাল্টি: নির্দিষ্ট ৪৫ দিনের মধ্যে টাকা না মেটালে অতিরিক্ত আরও ৬ শতাংশ পেনাল্টি সুদ গুণতে হবে স্টিল প্ল্যান্ট কর্তৃপক্ষকে।
মামলাকারীদের আইনজীবী উদয়শঙ্কর চট্টোপাধ্যায় জানান, শিক্ষকদের কর্মজীবনের প্রতিটি বছরের হিসাব কষে এই বকেয়া মেটাতে হবে। হাইকোর্টের এই রায়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন বছরের পর বছর ধরে প্রতারিত হওয়া দুর্গাপুরের শিক্ষকরা। এখন দেখার, আদালতের বেঁধে দেওয়া ৪৫ দিনের মধ্যেই ডিএসপি কর্তৃপক্ষ এই বিপুল অর্থ বকেয়া সুদে-আসলে মেটায় কি না।