প্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের কি জোর করে ঘরে আটকে রাখা যায়? এলাহাবাদ হাই কোর্টের ঐতিহাসিক রায়ে বড় ধাক্কা বাবা-মায়ের!

প্রাপ্তবয়স্ক কোনো মেয়েকে তাঁর ইচ্ছের বিরুদ্ধে জোর করে বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকতে বাধ্য করা যাবে না। একটি গুরুত্বপূর্ণ হেবিয়াস কর্পাস মামলার শুনানিতে এমনই স্পষ্ট পর্যবেক্ষণ জানিয়েছে এলাহাবাদ হাই কোর্ট। আদালত সাফ জানিয়ে দিয়েছে, কোনো ব্যক্তি যদি প্রাপ্তবয়স্ক হন এবং নিজের ভালো-মন্দ বা সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো পূর্ণ সক্ষমতা রাখেন, তবে তিনি কোথায় এবং কার সঙ্গে থাকবেন—সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সম্পূর্ণ স্বাধীনতা একমাত্র তাঁরই রয়েছে।
ঠিক কী ঘটেছিল আদালতে?
কলাবতী দেবী নামক এক মহিলার দায়ের করা একটি হেবিয়াস কর্পাস মামলার প্রেক্ষিতে এই তাৎপর্যপূর্ণ রায় দিয়েছে আদালত। ওই মহিলা তাঁর ২৫ বছরের প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ে কুমারী পূজাকে আদালতে সশরীরে হাজির করার আবেদন জানিয়েছিলেন। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী গত ১৭ আগস্ট পুলিশ ওই তরুণীকে নিরাপত্তা দিয়ে আদালতে হাজির করে।
আদালতের মুখোমুখি হয়ে যুবতী পূজা স্পষ্ট ভাষায় জানান যে, তিনি সম্পূর্ণ নিজের ইচ্ছেতেই দিল্লিতে স্বাধীনভাবে বসবাস করছেন। তাঁকে কেউ বেআইনিভাবে কোথাও আটকে রাখেনি। একইসঙ্গে তিনি আদালতের সামনে এও পরিষ্কার করে দেন যে, তিনি কোনোভাবেই তাঁর মায়ের সঙ্গে বাড়িতে ফিরে যেতে চান না। মায়ের বিরুদ্ধে অভিযোগের আঙুল তুলে পূজা জানান, পরিবারের তরফ থেকে তাঁর প্রতি আচরণ ভালো ছিল না এবং অতীতে তাঁকে একাধিকবার শারীরিক নির্যাতন ও মারধরের মুখোমুখি হতে হয়েছে। যদিও মেয়ের এই সমস্ত অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন তাঁর মা। উলটো দিকে মায়ের জেদ ছিল, মেয়েকে যেভাবেই হোক তাঁর সঙ্গেই বাড়ি ফিরে যেতে হবে।
বিচারপতির মুখোমুখি কথোপকথন ও চূড়ান্ত রায়
মামলার শুনানির সময় বিচারপতি সন্দীপ জৈন এজলাসে সরাসরি মেয়েটির সঙ্গে কথা বলেন এবং তাঁর প্রতিটি বক্তব্য অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে শোনেন। তরুণীর বক্তব্য ও সার্বিক পরিস্থিতি বিচার করে আদালত জানায়, পূজা আইনগতভাবে প্রাপ্তবয়স্ক এবং তিনি নিজের স্বাধীন বুদ্ধিতেই জীবনযাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ফলে তাঁকে জোর করে মায়ের সঙ্গে থাকতে বাধ্য করার প্রশ্নই ওঠে না। আদালতের স্পষ্ট অভিমত, শুধুমাত্র বাবা-মায়ের সন্তান হওয়ার কারণে কোনো প্রাপ্তবয়স্ক মানুষকে তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট কারও সঙ্গে থাকতে বাধ্য করা যায় না। সাবালক হওয়ার পর নিজের বাসস্থান এবং জীবনসঙ্গী বা জীবনযাপনের পথ বেছে নেওয়ার পূর্ণ সাংবিধানিক অধিকার তাঁর রয়েছে।
পাশাপাশি, হেবিয়াস কর্পাস (Habeas Corpus) আইনি প্রক্রিয়ার মূল উদ্দেশ্যও এ দিন আদালতের রায়ে স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেওয়া হয়। এই আইনি ব্যবস্থার প্রধান লক্ষ্য হলো—কোনো ব্যক্তিকে বেআইনি বা অবৈধভাবে আটকে রাখা হলে তাঁকে সেই বন্দিদশা থেকে মুক্ত করা। কিন্তু কোনো প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি যদি স্বেচ্ছায় কোথাও বসবাস করেন, তবে তাঁকে জোর করে বাবা-মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার হাতিয়ার হিসেবে এই আইনি প্রক্রিয়া ব্যবহার করা যায় না। সব দিক বিবেচনা করে শেষ পর্যন্ত কলাবতী দেবীর করা আবেদনটি খারিজ করে দেয় হাই কোর্ট। এর ফলে পূজা নিজের পছন্দের জায়গায় এবং নিজের স্বাধীন ইচ্ছামতো জীবন কাটানোর সম্পূর্ণ স্বাধীনতা লাভ করেন।