হার্ট অ্যাটাক, কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট আর হার্ট ফেইলিওর কি একই জিনিস? ৯৯% মানুষই জানেন না এই মারাত্মক ফারাক!

হার্ট অ্যাটাক (Heart Attack), কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট (Cardiac Arrest) এবং হার্ট ফেইলিওর (Heart Failure)— এই তিনটি মেডিকেল টার্ম বা পরিভাষা প্রায়শই আমরা একে অপরের পরিপূরক হিসেবে ব্যবহার করে থাকি। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, এই তিনটি সম্পূর্ণ আলাদা এবং স্বতন্ত্র চিকিৎসা সংক্রান্ত শর্ত বা কন্ডিশন। এই দুয়ের বা তিনের সুনির্দিষ্ট পার্থক্য জানা থাকলে প্রাথমিক অবস্থাতেই সতর্কবার্তা চিনে সময়মতো চিকিৎসা শুরু করা সম্ভব, যা সুস্থ হৃদরোগের পথে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
১. হার্ট অ্যাটাক: রক্ত সরবরাহে বাধা
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় যাকে ‘মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন’ (Myocardial Infarction) বলা হয়, সেই হার্ট অ্যাটাক মূলত ঘটে যখন হৃদপিন্ডের পেশির কোনো অংশে হঠাৎ করে রক্তপ্রবাহ সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ হয়ে যায়। সাধারণত ধমনীতে কোনো প্লাক ফেটে গিয়ে রক্ত জমাট বাঁধলেই এই বিপত্তি ঘটে। দ্রুত চিকিৎসা না করালে ক্ষতিগ্রস্ত হৃদপেশি চিরতরে নষ্ট হতে পারে।
প্রধান লক্ষণ: বুকের মাঝখানে বা বাঁ দিকে প্রচণ্ড চাপ ধরা, ভারী ভাব বা ব্যথা; যা হাত, কাঁধ, পিঠ, ঘাড় বা চোয়ালে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এর পাশাপাশি শ্বাসকষ্ট, ঠান্ডা ঘাম, বমি ভাব এবং অস্বাভাবিক ক্লান্তি দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে মহিলা, প্রবীণ এবং ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে এই লক্ষণগুলি অনেক সময় বেশ হালকা বা ভিন্ন ধরনের হতে পারে। হার্ট অ্যাটাকের জেরে অনেক সময় কার্ডিয়াক অ্যারেস্টও হতে পারে, তবে দুটি কিন্তু এক নয়।
২. কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট: হৃদযন্ত্রের বৈদ্যুতিক ত্রুটি
কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট ঘটে যখন কোনো বৈদ্যুতিক গোলযোগের কারণে হৃদপিন্ড হঠাৎ করে কার্যকরভাবে রক্ত পাম্প করা বন্ধ করে দেয়। এক্ষেত্রে আক্রান্ত ব্যক্তি সাধারণত সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন, সংজ্ঞাহীন হয়ে যান এবং স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নেওয়া বন্ধ করে দেন বা হাঁপাতে থাকেন। হার্ট অ্যাটাকের বিপরীতে কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট একটি অত্যন্ত দ্রুত এবং জীবনসংহারী জরুরি অবস্থা।
করণীয়: এই ধরনের পরিস্থিতিতে অবিলম্বে জরুরি চিকিৎসা পরিষেবা বা অ্যাম্বুলেন্সে খবর দিতে হবে, সিপিআর (CPR) শুরু করতে হবে এবং সম্ভব হলে দ্রুত এইডি (AED) ডিভাইস ব্যবহার করতে হবে। ডিফিব্রিলেশনের সাহায্য ছাড়া অতিবাহিত প্রতি মিনিট বেঁচে থাকার সম্ভাবনা মারাত্মকভাবে কমিয়ে দেয়, তাই দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া এখানে সবচেয়ে জরুরি।
৩. হার্ট ফেইলিওর: পাম্প করার ক্ষমতা কমে যাওয়া
হার্ট ফেইলিওর মানে এই নয় যে হৃদপিন্ড একেবারে কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। এর আসল অর্থ হলো, শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী পর্যাপ্ত রক্ত পাম্প করতে ব্যর্থ হচ্ছে হার্ট। করনারি আর্টারি ডিজিজ, পুরোনো হার্ট অ্যাটাক, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস বা হার্ট ভালভজনিত সমস্যার কারণে এটি ধীরে ধীরে বাসা বাঁধতে পারে।
প্রধান লক্ষণ: সামান্য পরিশ্রম করলেই বা শুয়ে থাকাকালীন শ্বাসকষ্ট হওয়া, দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি, পা ও গোড়ালি ফুলে যাওয়া, শরীরে জল জমার কারণে দ্রুত ওজন বৃদ্ধি, একটানা কাশি এবং শরীরচর্চা বা হাঁটার ক্ষমতা কমে যাওয়া। হার্ট ফেইলিওর তীব্র বা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে এবং এর জন্য দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসার প্রয়োজন হয়।
হৃদরোগ থেকে সুরক্ষিত থাকার উপায়
যদিও এই রোগগুলি আলাদা, তবুও এরা একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। যেমন— হার্ট অ্যাটাকের ফলে হৃদপেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পরবর্তীতে হার্ট ফেইলিওরের কারণ হতে পারে, আবার কিছু নির্দিষ্ট হৃদরোগ কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
বুকের অস্বস্তি, নতুন বা ক্রমবর্ধমান শ্বাসকষ্ট, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বা হঠাৎ করে লুটিয়ে পড়ার মতো লক্ষণগুলিকে কখনোই উপেক্ষা করা উচিত নয়। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা, রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখা, তামাকজাত দ্রব্য বর্জন করা, নিয়মিত এক্সারসাইজ করা এবং সুষম খাদ্য গ্রহণ করা কার্ডিওভাসকুলার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিতে পারে। হৃদযন্ত্রের সুরক্ষায় সঠিক ফারাক চিনে সময়মতো সঠিক পদক্ষেপই একটি জীবন বাঁচাতে পারে।