মাটি বাঁচালেই দ্বিগুণ হবে কৃষকের আয়! গ্রামীণ অর্থনীতি বদলে দিতে শুরু হল মেগা ‘রিফর্ম উৎসব’

গ্রামীণ এলাকার মানুষের কাছে জলবিভাজিকা বা ওয়াটারশেড উন্নয়নের সুফল সরাসরি পৌঁছে দিতে এক বিশেষ উদ্যোগ নিল প্রশাসন। কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের যৌথ উদ্যোগে রাজ্যজুড়ে শুরু হয়েছে ‘রিফর্ম উৎসব’। মূলত সাধারণ মানুষকে সচেতন করা এবং এই প্রকল্পে তাদের সরাসরি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই এই উৎসবের মূল লক্ষ্য। গত শুক্রবার, ২ অক্টোবর থেকে গ্রামসভাগুলির মাধ্যমে ‘সবকি যোজনা, সবকা বিকাশ’ বা পিপলস প্ল্যান ক্যাম্পেইনের অঙ্গ হিসেবে এই জনমুখী কর্মসূচির সূচনা হয়েছে।

কোন কোন এলাকায় থাকছে এই উৎসব?
রাজ্যের মোট ১২৬টি গ্রাম পঞ্চায়েতে এই উৎসবের মাধ্যমে জলবিভাজিকা উন্নয়ন সংক্রান্ত নানা সংস্কারের তথ্য সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে। এর অধীনে মোট ২৭টি জলবিভাজিকা উন্নয়ন প্রকল্প রয়েছে। পরবর্তী পর্যায়ে ১৪টি জেলা ও প্রকল্প স্তরেও এই ‘রিফর্ম উৎসব’-এর নানা কর্মসূচির আয়োজন করা হবে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই প্রকল্পে রাজ্যে ইতিমধ্যেই ১ লক্ষ ২৯ হাজার ২০০ হেক্টর জমিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যার ফলে ২ লক্ষ ২৯ হাজার ৪১৮ জন প্রান্তিক কৃষক ও কৃষিজীবী মানুষ সরাসরি উপকৃত হয়েছেন।

খরা কাটিয়ে সবুজ বিপ্লব ও কৃষকদের আয় বৃদ্ধি
‘মাটি বাঁচালেই জল বাঁচানো সম্ভব’—এই নীতিকে সামনে রেখেই জল সুরক্ষিত গ্রাম এবং কৃষকদের উন্নতি সাধনের লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। খরাপ্রবণ যে সমস্ত এলাকায় আগে একটিও ফসল ফলত না, সেখানে এখন অন্তত একটি ফসল চাষ করা সম্ভব হচ্ছে। আবার যেখানে আগে মাত্র একটি ফসল হতো, সেখানে কৃষকরা এখন একাধিক ফসল ফলাচ্ছেন। এর ফলে কৃষিজ উৎপাদন ও কৃষকদের রোজগার দুই-ই উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে।

দেশজুড়ে গত ১২ বছরে প্রায় ৩.৪ কোটি হেক্টর জমিকে এই জলবিভাজিকা উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় আনা হয়েছে। কাজ শেষ হওয়া প্রকল্পগুলির যে চিত্র সামনে এসেছে, তাতে দেখা গিয়েছে ভূগর্ভস্থ জলের স্তর ৩ মিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশাপাশি চাষযোগ্য জমির পরিমাণ ৩০ শতাংশ, দুধের উৎপাদন ৪০ শতাংশ এবং কৃষকদের বার্ষিক আয় প্রায় ৭০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রশাসন জানিয়েছে, এই সরকারি কর্মসূচিকে একটি পূর্ণাঙ্গ জনআন্দোলনে পরিণত করাই বৃহত্তর লক্ষ্য, যেখানে সাধারণ মানুষ জল ও মাটি সংরক্ষণের পরিকল্পনা রূপায়ণে সক্রিয় ভূমিকা পালন করবেন।

বরাদ্দ বৃদ্ধি ও কাজের সময়সীমা কমল
গত ১২ বছরে ডব্লিউডিসি-পিএমকেএসওয়াই (WDC-PMKSY) প্রকল্পে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার আনা হয়েছে। সমতল এলাকায় হেক্টরপ্রতি বরাদ্দ ১২ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ২২ হাজার টাকা করা হয়েছে। অন্যদিকে, পাহাড়ি ও দুর্গম এলাকার জন্য এই বরাদ্দ ১৫ হাজার থেকে বাড়িয়ে ২৮ হাজার টাকা করা হয়েছে। এর ফলে গ্রামে মাটি ও জল সংরক্ষণের কাজ আরও উন্নত মানের হচ্ছে। শুধু তাই নয়, কাজের গতি বাড়াতে প্রকল্পের সময়সীমা ৭ বছর থেকে কমিয়ে ৫ বছর করা হয়েছে। এতে দ্রুত কাজ শেষ হওয়ার পাশাপাশি মাটির ক্ষয় রোধ করা সম্ভব হচ্ছে। উন্নত বীজ, চারাগাছ ও কৃষি যন্ত্রপাতির জোগান বাড়িয়ে কৃষকদের স্বাবলম্বী করার দিকেও বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে।

সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে দেশজুড়ে ‘ওয়াটারশেড যাত্রা’ এবং ‘ওয়াটারশেড মহোৎসব’-এর মতো কর্মসূচি গ্রহণ করেছে সংশ্লিষ্ট দফতর। কৃষি দফতরের পক্ষ থেকে জেলা ও প্রকল্প স্তরের রূপায়ণকারী সংস্থাগুলিকে ‘রিফর্ম উৎসব’-এ সর্বাধিক মানুষের উপস্থিতি নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ২০৪৭ সালের মধ্যে উন্নত ভারতের স্বপ্নপূরণের লক্ষ্যে একটি খরামুক্ত দেশ গড়তেই প্রতিটি গ্রামে এই সংস্কারগুলি পৌঁছে দেওয়ার কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *