“পকেটে টান পড়তে চলেছে!”-জেনেনিন হু হু করে দাম বাড়ছে কিসের কিসের?

উৎসবের মরসুমের ঠিক আগে সাধারণ মানুষের পকেটে বড়সড় ছাঁট পড়ার আশঙ্কা। ১ অক্টোবর থেকে বাণিজ্যিক গ্যাস সিলিন্ডার ও বিমানের জ্বালানির দাম একলাফে অনেকটাই বেড়েছে। পাশাপাশি এসি, টিভি, ফ্রিজ এবং ওয়াশিং মেশিনের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় ইলেকট্রনিক পণ্যের দামও বাড়ার জোরালো সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। আপাতভাবে এগুলো আলাদা খবর মনে হলেও, এর নেপথ্যে মূল কারণ একটাই—ভারত বিপুল পরিমাণে জ্বালানি ও কাঁচামাল বিদেশ থেকে আমদানি করে, যার ফলে আমদানির উপর দেশের নির্ভরতা অত্যন্ত বেশি। আর এর জেরে পুজোর আগেই কি দেশে মূল্যবৃদ্ধির ব্যাপক মার পড়তে চলেছে? উঠছে সেই প্রশ্নই।

১. হোটেল-রেস্তোরাঁয় খাবারের খরচ কি বাড়বে?

১ অক্টোবর থেকে ১৯ কেজির বাণিজ্যিক এলপিজি সিলিন্ডারের দাম বাড়ানো হয়েছে। হোটেল, রেস্তোরাঁ, ধাবা, মিষ্টির দোকান এবং ক্যাটারিং সংস্থাগুলিতে এই সিলিন্ডার ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। যদিও স্বস্তির বিষয় হলো, সাধারণ ঘরের রান্নার গ্যাসের দাম আপাতত বাড়েনি। তবে বাণিজ্যিক গ্যাসের দাম বাড়ায় রাস্তার চা থেকে শুরু করে হোটেলের সুস্বাদু খাবারের দামও যে স্বাভাবিকভাবেই বাড়বে, তা একপ্রকার নিশ্চিত।

২. কেন বাড়ছে গ্যাস ও জ্বালানির দাম?

ভারতের এলপিজি আমদানির প্রায় ৯০ শতাংশই দীর্ঘকাল ধরে পশ্চিম এশিয়ার সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, কাতার ও কুয়েতের উপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু বর্তমানে ওই অঞ্চলে গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের বাধা সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে বিকল্প হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে গ্যাস আমদানি ৮ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশের বেশি করা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, আমেরিকা থেকে এত গ্যাস কেনা সত্ত্বেও কেন কমছে না দাম? বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ সমুদ্রপথে পরিবহণ খরচ, মার্কিন ডলারের বিনিময় হার এবং আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাসের চড়া দামই এর মূল কারণ।

৩. ইলেকট্রনিক্স পণ্যের দাম কেন বাড়ছে?

টিভি, ফ্রিজ এবং অন্যান্য ইলেকট্রনিক পণ্যের দাম প্রায় ৫ থেকে ৮ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তুতি চলছে। কারণ, এই পণ্যগুলি তৈরিতে কপার, স্টিল, অ্যালুমিনিয়াম এবং প্লাস্টিকের মতো যে কাঁচামাল লাগে, তার একটা বড় অংশ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে কপার, অ্যালুমিনিয়াম, স্টিল ও অপরিশোধিত তেলের আন্তর্জাতিক দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি ভারতীয় মুদ্রার দুর্বল হওয়ার কারণে প্রস্তুতকারী সংস্থাগুলির উৎপাদন খরচ একলাফে অনেকটাই বেড়ে গেছে।

৪. আকাশছোঁয়া বিমান ভাড়া

অক্টোবর মাসে বিমানের জ্বালানি বা এটিএফ (ATF)-এর দাম লিটার প্রতি প্রায় ১৬ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। এর আগে অগাস্টে প্রায় ৫ টাকা এবং সেপ্টেম্বরে ৬.২৮ টাকা দাম বেড়েছিল। অর্থাৎ, টানা তৃতীয় মাসের মতো বিমান সংস্থাগুলির জ্বালানি খরচ বৃদ্ধি পেল। যেহেতু পুজোর মরসুমে বাড়ি ফেরার জন্য প্রচুর মানুষ আকাশপথকে বেছে নেন, তাই আগামী কয়েক সপ্তাহে বিমান ভাড়াতেও বড় ধরনের চাপ পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

৫. কি বাড়ছে ইএমআই-এর বোঝা?

পাশাপাশি রিজার্ভ ব্যাঙ্ক (RBI) সুদের হার বাড়াতে পারে বলে জল্পনা চলছে। সুদের হার বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই গৃহঋণ বা অন্যান্য ঋণের উপর ইএমআই (EMI)-এর চাপও বৃদ্ধি পাবে। উদাহরণস্বরূপ, কেউ যদি ২০ বছরের জন্য ৫০ লক্ষ টাকা ঋণ নিয়ে থাকেন, তবে রেপো রেট মাত্র ০.২৫ শতাংশ বাড়লে মাসিক ইএমআই প্রায় ৭৮০ টাকা এবং তা ৫০ বেসিস পয়েন্ট বাড়লে ইএমআই প্রায় ১৫০০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে।

এখন কোথায় দাঁড়িয়ে মূল্যবৃদ্ধি?

চলতি বছরের অগাস্ট মাসে খুচরো মূল্যবৃদ্ধির হার ছিল ৪.৮ শতাংশ। সাধারণ মানুষ দৈনন্দিন জীবনে যে সমস্ত পণ্য ও পরিষেবা ব্যবহার করেন, তার দাম গত বছরের তুলনায় গড়ে কতটা বেড়েছে, তা এই পরিসংখ্যানের মাধ্যমেই পরিমাপ করা হয়। যা রিজার্ভ ব্যাঙ্কের নির্ধারিত ৪ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় কিছুটা বেশি। একই সঙ্গে পাইকারি মূল্যবৃদ্ধির জল্পনাও উর্ধ্বমুখী। সবমিলিয়ে, পুজোর আনন্দকে ফিকে করে অর্থনৈতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির কালো মেঘ এখন ঘনীভূত হচ্ছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *