“ওঁকে মরতে দেব না!’-৬ বছরের শিশুর এক চিৎকারে প্রাণে বাঁচলেন ১৮০ জন যাত্রী?

মাঝ আকাশে উড়ন্ত বিমানের ককপিটের ভেতরে ঘটে গেল এক ভয়ঙ্কর ও শিহরণ জাগানো ঘটনা। ওমানি কো-পাইলটের অতর্কিত ছুরি হামলায় রক্তাক্ত হলেন ভারতীয় পাইলট স্মিত মচ্ছর। কিন্তু এক ৬ বছরের ইজ়রায়েলি শিশুর বুদ্ধিমত্তা এবং কয়েকজন সাহসী যাত্রীর চরম সাহসিকতার জেরে অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে গেলেন বিমানে থাকা প্রায় ১৮০ জন ক্রু ও যাত্রী। সিনেমার চিত্রনাট্যকেও হার মানানো এই রোমহর্ষক ঘটনাটি ঘটেছে গত বুধবার, সংযুক্ত আরব আমিরশাহির দুবাই থেকে ইজ়রায়েলের তেল আভিভগামী ‘ফ্লাইদুবাই’-এর FZ1073 ফ্লাইটে।

বাথরুম থেকে ফিরে আসতেই বিপদের আঁচ

ফ্লাইটের ফার্স্ট রো-তেই বসেছিলেন ইজ়রায়েলি যাত্রী জ়ভিকা ম্যানেস। তাঁর ছয় বছরের ছোট্ট মেয়ে নিনা বাথরুমে গিয়েছিল। বাথরুম থেকে ফিরে আসার ঠিক তখনই ফ্লাইটের ককপিট থেকে হঠাৎ কান্নার ও আতঙ্কের চিৎকার শোনা যায়। থতমত খেয়ে ভয়ে পিছিয়ে আসে শিশুটি।

মেয়ের কাণ্ড দেখে বাবা জ়ভিকা এগিয়ে যান। নিউ ইয়র্ক টাইমস-কে তিনি জানান, মেয়ে তাঁর কাছে ছুটে এসে বলেছিল, “বাবা, ওঁকে আমরা মরতে দেব না!” মেয়ের মুখে এই কথা শুনে চমকে ওঠেন জ়ভিকা। তখনই তাঁর নজর যায় ককপিটের দিকে।

ককপিটের ভেতরে রক্তারক্তি ও ধস্তাধস্তি

দেখা যায়, ককপিটের দরজা খানিকটা খোলা রয়েছে। আর তার ভেতর থেকেই রক্তাক্ত অবস্থায় বেরিয়ে আসেন ভারতীয় পাইলট স্মিত মচ্ছর। তাঁর শরীরে একাধিক ছুরির কোপ। সেই অবস্থাতেও তিনি হার মানেননি, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে লড়ে যাচ্ছিলেন। জ়ভিকার কথায়, “ককপিটের ভিতরে তাকিয়ে দেখি সব জিনিসপত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে, চারদিকে শুধু রক্তের দাগ।”

অভিযোগ, ওমানি কো-পাইলট তখন খ্যাপা কুকুরের মতো রণমূর্তি ধারণ করেছেন। চোখের সামনে নিজের সহকর্মীকে উপর্যুপরি ছুরি দিয়ে কোপাচ্ছিলেন তিনি। এই ভয়াবহ দৃশ্য দেখে প্রথমটায় কী করবেন বুঝতে পারেননি জ়ভিকা। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে নিজের সাহসিকতা প্রমাণ করে তিনি ঝাঁপিয়ে পড়েন। সঙ্গে এগিয়ে আসেন আরও দুই যাত্রী—আসাফ রাজুয়ান এবং ইয়ানিভ হায়ুন।

তিনজন মিলে কোনোমতে ওই কো-পাইলটকে জাপটে ধরেন। কিন্তু তাঁর শক্তি এতটাই বেশি ছিল যে কিছুতেই তাঁকে কাবু করা যাচ্ছিল না। শেষপর্যন্ত চরম বুদ্ধিমত্তা খাটিয়ে বিমানের হেডফোনের তার দিয়েই তাঁকে শক্ত করে বেঁধে ফেলেন ওই যাত্রীরা।

আকস্মিক পতন ও ভয়াবহ পরিস্থিতি

এই নাটকের মাঝেই শুরু হয় বিপদের অন্য এক অঙ্ক। ধস্তাধস্তির জেরে বিমানটি হঠাৎ করেই তীব্র গতিতে নিচের দিকে নামতে শুরু করে (Rapid Descent)। বিমানের ভেতরে শুরু হয়ে যায় চরম আতঙ্ক ও হুড়হুড়ি। যাত্রীরা অনেকেই সিট থেকে ছিটকে পড়েন। সে এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতি, যেন কোনো হরর মুভি চলছে।

অবশেষে সংকটজনক মুহূর্তে ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হন বিমানে থাকা দুই অবসরপ্রাপ্ত পাইলট। তাঁরা সঙ্গে সঙ্গে ককপিটে গিয়ে পাইলটের আসন গ্রহণ করেন এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে বিমানটিকে নিরাপদে সৌদি আরবের তাবুক বিমানবন্দরে অবতরণ করান।

বর্তমান পরিস্থিতি

তাবুকে অবতরণের পর আহত অবস্থায় যাত্রীদের অনেকেই রক্তমাখা পোশাকে বিমান থেকে নামেন। এরপর তাবুক থেকেই ফ্লাইদুবাইয়ের অন্য একটি বিমানে করে যাত্রীদের তেল আভিভে পাঠানো হয়। হামলায় মারাত্মকভাবে আহত ভারতীয় পাইলট স্মিত মচ্ছরকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বর্তমানে তাঁর শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল বলে জানা গিয়েছে। ছ বছরের একটি শিশুর কৌতূহল এবং যাত্রীদের চরম সাহসিকতা সেদিন এক বড় বিমান দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা করল শত শত প্রাণকে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *