জঙ্গলের মাঝে অলৌকিক আবির্ভাব! আড়াইশো বছর ধরে কীভাবে দুর্গাপুরের জামবন গ্রামে পুজিত হন শ্যামা রূপা?

বাঙালির শারদোৎসব মানেই আলোয় সেজে ওঠা মণ্ডপ আর ঠাকুর দেখার চেনা উল্লাস। কিন্তু এর বাইরেও বাংলার বিভিন্ন কোণে ছড়িয়ে রয়েছে এমন কিছু প্রাচীন পুজো, যার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে গা ছমছমে ইতিহাস, রূপকথার মতো লোকগাথা আর অদ্ভুত সব অলৌকিক বিশ্বাসের গল্প। দুর্গাপুরের জামবন গ্রামের আড়াইশো বছরের প্রাচীন শ্যামা রূপা পুজো এমনই এক অনন্য ঐতিহ্যের প্রতীক, যা আজও সাধারণ মানুষের মনে গভীর বিস্ময় জাগায়।
জঙ্গলের আশ্রয় এবং স্বপ্নাদেশ স্থানীয় লোকশ্রুতি অনুযায়ী, অতীতে একবার ভয়াবহ বজ্রপাত এবং ডাকাতদের লাগাতার তাণ্ডবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন গ্রামবাসীরা। বাধ্য হয়েই তাঁরা নিজেদের আদি ভিটে ছেড়ে জঙ্গলে ঘেরা বিদবিহারের একটি জামের বাগানে গিয়ে আশ্রয় নেন। সেই থেকেই এই অঞ্চলের নাম হয় জামবন। কিন্তু জঙ্গলঘেরা সেই নতুন জায়গায় এসে শুরু হয় অন্য সংকট। তীব্র খরায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে চাষবাস, মাথায় হাত পড়ে কৃষকদের। ঠিক সেই চরম দুর্দিনের মাঝেই গ্রামের এক বাসিন্দা বিনোদবিহারী রায় এক রাতে দিব্য স্বপ্নাদেশ পান। দেবী তাঁকে নির্দেশ দেন ওই মাটিতে দেবীমূর্তি প্রতিষ্ঠা করার।
সুদিন ফেরা এবং শ্যামা রূপার আরাধনা স্বপ্নাদেশ পাওয়ার পরেই আর কালবিলম্ব করেননি গ্রামবাসীরা। জঙ্গল পরিষ্কার করে শুরু হয় দেবীর আরাধনা। দুর্গারূপেই সেখানে পূজিতা হতে শুরু করেন ‘শ্যামা রূপা’। গ্রামবাসীদের দৃঢ় বিশ্বাস, দেবীর এই পুজো শুরু হওয়ার পরেই এলাকার চেহারা সম্পূর্ণ বদলে যায়। খরা কাটিয়ে ফের সুদিন ফিরে আসে চাষবাসে। শুধু তাই নয়, চোর-ডাকাতের উপদ্রব থেকেও গ্রাম সুরক্ষিত থাকে, আর সেই থেকেই দেবী তাঁদের কাছে সাক্ষাৎ রক্ষাকর্তা হিসেবে পূজিত হয়ে আসছেন।
সময়ের পরিবর্তনেও অটুট বিশ্বাস আড়াইশো বছরের দীর্ঘ পথপরিক্রমায় জামবন গ্রামের চেহারা ও আধুনিকতায় অনেক বদল এসেছে। জঙ্গলের সেই ছোট্ট আরাধনা আজ পাকা মন্দিরে রূপ নিয়েছে, যেখানে পূজিতা হন পূর্ণাঙ্গ দুর্গামূর্তিও। তবে বদলায়নি কেবল দেবীর সেই পুরনো নাম—শ্যামা রূপা। পুজো মানেই তাই জামবনবাসীর কাছে কেবল উৎসব নয়, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বয়ে চলা এক জীবন্ত ইতিহাস ও বিশ্বাসের দলিল।