৬৬০০ কোটির মেগা আইপিও! সেবির সবুজ সঙ্কেত পেতেই শেয়ার বাজারে ঝড় তুলতে আসছে কার্লসবার্গ

বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় ও বিখ্যাত মদ প্রস্তুতকারক সংস্থা কার্লসবার্গের (Carlsberg) ভারতীয় ব্যবসা এবার অফিশিয়ালি শেয়ার বাজারে পা রাখার চূড়ান্ত অনুমতি পেয়ে গেল। দেশের বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা সেবি (SEBI) সম্প্রতি কার্লসবার্গ ইন্ডিয়ার ইনিশিয়াল পাবলিক অফারিং বা আইপিও-কে (IPO) সবুজ সঙ্কেত দিয়েছে। আপনি যদি ‘টিউবার্গ’ (Tuborg) কিংবা ‘কার্লসবার্গ’ (Carlsberg) বিয়ার ব্র্যান্ডের নিয়মিত ক্রেতা বা অনুরাগী হয়ে থাকেন, তবে এই খবরটি আপনার জন্য অত্যন্ত আকর্ষণীয় হতে চলেছে। কারণ, বিশ্বজুড়ে সমাদৃত এই জনপ্রিয় ব্র্যান্ডগুলির চালিকাশক্তি এবার ভারতীয় শেয়ার বাজারে তাদের মেগা পাবলিক অফারিং নিয়ে হাজির হচ্ছে।

৬,৬০০ কোটি টাকা তোলার বিশাল পরিকল্পনা
আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, কার্লসবার্গ ইন্ডিয়া এই আইপিও-র মাধ্যমে ভারতীয় বাজার থেকে প্রায় ৬,৬০০ কোটি টাকা (যা প্রায় ৭০ কোটি ডলারের সমান) তোলার পরিকল্পনা করেছে। বিশেষ বিষয় হলো, এই আইপিও-র ক্ষেত্রে সম্পূর্ণভাবে অফার ফর সেল (OFS) পদ্ধতিটি অনুসরণ করা হবে। অর্থাৎ, এর সহজ অর্থ দাঁড়ায় যে, কোম্পানির বর্তমান প্রোমোটার বা আদি বিনিয়োগকারীরা এই প্রক্রিয়ায় তাঁদের হাতে থাকা শেয়ার বাজারে বিক্রি করবেন এবং এর মাধ্যমে নতুন কোনো ফ্রেশ শেয়ার ইস্যু করা হবে না। বাজার বিশেষজ্ঞদের জোরালো অনুমান, চলতি বছরের শেষ প্রান্তিকের মধ্যেই এই কোম্পানির স্টক স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত (Listed) হয়ে যেতে পারে।

গোপনীয় নথি জমা দেওয়ার অভিনব কৌশল
বেশ কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হলো, কার্লসবার্গ ইন্ডিয়া গত ১ জুলাই সেবি-র কাছে অত্যন্ত গোপনীয়ভাবে তাদের আইপিও-র প্রাথমিক নথি জমা দিয়েছিল। এভাবে গোপনীয়ভাবে নথি দাখিল করার প্রধান সুবিধা হলো, তালিকাভুক্তির বিষয়ে চূড়ান্ত এবং পাকাপোক্ত কোনো সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত কোম্পানি তাদের অত্যন্ত সংবেদনশীল আর্থিক তথ্য বা কৌশলগত বিষয়গুলো প্রকাশ্যে আনে না। এর ফলে বড় বড় কোম্পানিগুলো তাদের ব্যবসার গোপন তথ্য, আর্থিক স্বাস্থ্য এবং বাজারের বিভিন্ন ঝুঁকি সরাসরি প্রতিযোগীদের হাত থেকে সুরক্ষিত রাখতে পারে।

প্রয়োজন পড়লে এই নিয়মের সুবিধা নিয়ে কোম্পানিগুলো বড় কোনো তথ্য সর্বসমক্ষে না এনেই তাদের ড্রাফট বা খসড়া প্রত্যাহার করে নিতে পারে। সাধারণ আইপিও প্রক্রিয়ায় জমা দেওয়া ড্রাফটগুলো সঙ্গে সঙ্গেই পাবলিক নথিতে পরিণত হয়। এই বিশাল আকৃতির আইপিও প্রক্রিয়াটি সুচারুভাবে সম্পন্ন করার জন্য কোম্পানিটি কোটাক মাহিন্দ্রা ক্যাপিটাল, জেপি মরগ্যান চেজ এবং সিটিগ্রুপের শীর্ষস্থানীয় ভারতীয় শাখাগুলির সাহায্য নিচ্ছে। তবে বাজার পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে এই আইপিও-র আকার, আর্থিক কাঠামো বা সময়সূচীতে ভবিষ্যতে কিছু পরিবর্তন আসতে পারে।

ভারতে কার্লসবার্গের শক্ত অবস্থান ও অন্যান্য কোম্পানির অনুমোদন
ভারতের বিয়ার বাজারের মোট শেয়ারের প্রায় ২২ শতাংশ দখল করে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মদ প্রস্তুতকারক হিসেবে নিজেদের শক্ত অবস্থান বজায় রেখেছে কার্লসবার্গ ইন্ডিয়া। ২০০৭ সালে ভারতে নিজেদের বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করেছিল এই বহুজাতিক সংস্থাটি, যদিও বিশ্বব্যাপী কার্লসবার্গ গ্রুপের দীর্ঘ গৌরবময় যাত্রার ইতিহাস শুরু হয়েছিল ১৮৪৭ সালে।

বর্তমানে সারা ভারত জুড়ে মোট ১৪টি অত্যাধুনিক ব্রুয়ারি পরিচালনা করছে এই কোম্পানি। এর মধ্যে আটটি ব্রুয়ারি সম্পূর্ণভাবে কোম্পানির সরাসরি মালিকানাধীন, আর বাকি ছয়টি চুক্তিভিত্তিক উৎপাদন (Contract Manufacturing) ইউনিটের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। তাদের মূল পোর্টফোলিওতে কার্লসবার্গ, টিউবার্গ, হলস্টেন, সোমার্সবি এবং গ্রিমবারগেনের মতো জনপ্রিয় গ্লোবাল ব্র্যান্ডগুলি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বর্তমানে ভারতে তাদের মূল ও সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হলো ইউনাইটেড ব্রুয়ারিজ লিমিটেড (UBL)। এছাড়া ‘অ্যাবসোলিউট ভদকা’ প্রস্তুতকারক খ্যাত পার্নো রিকার্ডও (Pernod Ricard) খুব শীঘ্রই একটি আইপিও বাজারে আনার কথা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।

উল্লেখ্য, শুধু কার্লসবার্গ ইন্ডিয়াই নয়, সেবি একই সঙ্গে আরও তিনটি ভিন্ন কোম্পানির আইপিও অনুমোদন করেছে। এই তালিকায় রয়েছে—টিএমসি ট্রান্সফর্মার্স (ইন্ডিয়া) লিমিটেড, উজিন ফার্মা লিমিটেড এবং মাতঙ্গি রাবার লিমিটেড। এর মধ্যে টিএমসি ট্রান্সফর্মার্স প্রায় ৫৫০ কোটি টাকার একটি আইপিও নিয়ে আসছে, যেখানে পুরোপুরি নতুন শেয়ার ইস্যু করা হবে। অন্যদিকে, উজিন ফার্মার আইপিও-তে ১ কোটি ১৮ লক্ষ নতুন শেয়ার ইস্যু করা হবে এবং কোম্পানির প্রোমোটাররা ওপেন হাউস স্টক এক্সচেঞ্জের (OFS) মাধ্যমে ৭২.৮২ লক্ষ শেয়ার বিক্রি করার সুযোগ পাবেন। সবমিলিয়ে এই মেগা আইপিওগুলি ভারতীয় শেয়ার বাজারে বড় ধরনের আলোড়ন সৃষ্টি করতে চলেছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *