পুরো এডিটোনিয়াল টিমকে হাতকড়া! মিশরে গণমাধ্যমের ওপর এ কী ভয়ঙ্কর আঘাত এল?

মিশরীয় কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করার এক চরম পদক্ষেপ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। দেশটির জনপ্রিয় স্বাধীন গণমাধ্যম ‘মাতসাদাস’ (Matsadas)-এর সম্পূর্ণ সম্পাদকীয় দলসহ মোট ছয়জন সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। নিষিদ্ধ ঘোষিত মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে যোগাযোগ এবং সরকারের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও বানোয়াট খবর ছড়ানোর গুরুতর অভিযোগে তাদের আটক করা হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রশাসন। এই গণগ্রেপ্তারের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে ইতিমধ্যে বিশ্বজুড়ে ৮০টিরও বেশি আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক মানবাধিকার সংস্থা সরব হয়েছে এবং কারাবন্দী সাংবাদিকদের অবিলম্বে নিঃশর্ত মুক্তির দাবি জানিয়েছে। যদিও মাতসাদাসের সহ-প্রতিষ্ঠাতা আবদেলরহমান মনসুর, যিনি বর্তমানে মিশরের বাইরে অবস্থান করছেন, এক বিবৃতিতে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে প্রশাসনের এই সমস্ত দাবি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন।
আট বছরের পথচলা ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা
প্রায় আট বছর আগে একটি স্বাধীন তথ্য যাচাইকারী প্ল্যাটফর্ম (ফ্যাক্ট-চেকিং ওয়েবসাইট) হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল এই গণমাধ্যম সংস্থাটি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর পরিসর বৃদ্ধি পায় এবং বর্তমানে এটি মিশরসহ অন্যান্য আরব দেশগুলোতে গভীর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের ওপর বিশেষ মনোযোগ দিয়ে কাজ করে আসছিল।
সহ-প্রতিষ্ঠাতা মনসুর স্মৃতিচারণ করে জানিয়েছেন যে, এর আগেও ২০২৩ সালে এই পত্রিকাটির দুজন সম্পাদককে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তবে সেই সময় রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা তদন্তকারীরা মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে তাঁদের কোনো ধরনের যোগসূত্রের বিন্দুমাত্র প্রমাণ খুঁজে না পাওয়ায়, কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক অভিযোগ ছাড়াই তাঁদের মুক্তি দিতে বাধ্য হয়েছিল প্রশাসন। মনসুর আক্ষেপের সুরে প্রশ্ন তুলেছেন, ‘‘ঠিক কী কারণে হঠাৎ আবার এমনটা করা হচ্ছে, তা আমাদের কাছে একেবারেই বোধগম্য নয়।’’
মিশরে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও বন্দিদশা
আমেরিকান মানবাধিকার সংস্থা ‘কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস’-এর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান বিশ্বে সর্বোচ্চ সংখ্যক সাংবাদিককে কারারুদ্ধ করে রাখা দেশগুলোর তালিকার শীর্ষে রয়েছে মিশর। দেশটির অন্যতম শীর্ষস্থানীয় মানবাধিকার সংস্থা ‘ইজিপশিয়ান ইনিশিয়েটিভ ফর পার্সোনাল রাইটস’ জানিয়েছে যে, এই মুহূর্তে অন্তত ২৬ জন সাংবাদিক মিশরের বিভিন্ন গোপন কারাগারে বন্দী অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন, আর তাঁদের অনেকেরই বর্তমান শারীরিক অবস্থা বা সুনির্দিষ্ট অবস্থান সম্পর্কে পরিবার বা সহকর্মীরা সম্পূর্ণ অন্ধকারে রয়েছেন।
মিশরীয় প্রশাসনের সাফাই
অন্যদিকে, এই গোটা ঘটনা প্রসঙ্গে মিশরের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, ‘মাতসাদাশ’ আদতে বিদেশে বসবাসকারী নিষিদ্ধঘোষিত মুসলিম ব্রাদারহুডের এক পলাতক সদস্যের (যিনি মনসুর নামে পরিচিত) দ্বারা পরিচালিত একটি লাইসেন্সবিহীন ফেসবুক পেজ বা সংবাদ মাধ্যম ছিল।
মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত বিবৃতিতে আরও দাবি করা হয়েছে যে, সম্প্রতি গ্রেপ্তার হওয়া ছয়জন ব্যক্তি মূলত ওই ব্রাদারহুডের গোপন মিডিয়া কমিটির সক্রিয় সদস্য ছিলেন। তাঁরা নাকি সরাসরি মনসুরের নির্দেশেই সরকারের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর সংবাদ তৈরি করতেন এবং সেগুলি সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ করতেন। প্রশাসনের দাবি, ধৃত এই ছয়জনের মধ্যে কেবল একজনমাত্র ‘ন্যাশনাল প্রেস ইউনিয়ন’ বা সাংবাদিক সিন্ডিকেটের সদস্য। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, তবে এই মুহূর্তে তাঁদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের কোনো পূর্ণাঙ্গ ও বিশদ বিবরণ প্রকাশ করা হয়নি। সবমিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের এই গণমাধ্যম দমন নীতি বিশ্বজুড়ে সাংবাদিক মহলে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।