মল্লিক বাড়ির পুজোর অন্দরের গোপনীয়তা ফাঁস! কোয়েলদের শতাব্দীপ্রাচীন দুর্গাপুজোয় কোন কোন অদ্ভুত নিয়ম মানা হয়?

তিলোত্তমার বুকে সাবেকি দুর্গাপুজোর কথা উঠলেই যে ক’টি নাম সবার আগে মানসপটে ভেসে ওঠে, তাদের মধ্যে অন্যতম হলো ভবানীপুরের বিখ্যাত ‘মল্লিক বাড়ি’। বিশিষ্ট অভিনেতা রঞ্জিত মল্লিক ও টলিউড ডিভা কোয়েল মল্লিকের এই ঐতিহ্যবাহী পরিবারের দুর্গোৎসবের রূপ, রং ও আভিজাত্য সব সময়ই সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে অনুরাগীদের মধ্যে দারুণ কৌতূহল তৈরি করে। ১৯২৫ সালে শুরু হওয়া এই প্রাচীন পুজোর ইতিহাস কেবল আভিজাত্য বা জাঁকজমক নয়, বরং নানা অনন্য ও শতাব্দীপ্রাচীন রীতি-নীতির নিখুঁত মেলবন্ধনে সমৃদ্ধ।
গুপ্তিপাড়া থেকে ভবানীপুর: শতবর্ষের পথচলা
এই বিখ্যাত পরিবারের দুর্গাপুজোর সূচনা হয়েছিল ১৯২৫ সালে, রাধাগোবিন্দ মল্লিকের পুত্র সুরেন্দ্রমাধব মল্লিকের হাত ধরে। তবে ভবানীপুরের এই ঠিকানায় আসার আগে হুগলির গুপ্তিপাড়ায় তাঁদের আদি নিবাসেই দেবী আরাধনার প্রচলন ছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঠিকানা বদলালেও পুরনো সংস্কার, আচার ও নিয়মকানুন আজও এক চুলও বদলায়নি। শুধু রঞ্জিত বা কোয়েল মল্লিকই নন, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত এবং বিখ্যাত ‘ইকমিক কুকার’-এর উদ্ভাবক ইন্দুমাধব মল্লিক কিংবা প্রখ্যাত রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী প্রমিতা মল্লিকের মতো বরেণ্য ব্যক্তিত্বদের নামও জড়িয়ে রয়েছে এই কুলজাতীয় পরিবারের সঙ্গে।
গয়না পরান নারীরা, অস্ত্র তুলে দেন পুরুষেরা
মল্লিক বাড়ির পুজোয় প্রতিমা গড়ার প্রস্তুতি শুরু হয় একেবারে জন্মাষ্টমীর দিন দেবীর কাঠামো পুজোর মাধ্যমে। একচালা সাবেকি প্রতিমা এবং নিখাদ ডাকের সাজে সজ্জিত হয়ে ওঠেন মা দুর্গা। তবে প্রতিমার সাজসজ্জা ও রূপদানের ক্ষেত্রে রয়েছে এক অত্যন্ত চমকপ্রদ ও অভিনব নিয়ম—দেবীকে সোনার অলঙ্কার পরানোর সম্পূর্ণ দায়িত্ব থাকে পরিবারের নারীদের হাতে, আর অন্যদিকে দেবীর হাতে অস্ত্র তুলে দেওয়ার বিশেষ কাজটি করেন পরিবারের পুরুষ সদস্যরা।
বৈষ্ণব রীতি ও বিশেষ নৈবেদ্যর কায়দা
মল্লিক বাড়ি আদ্যোপান্ত বৈষ্ণব মতাবলম্বী একটি পরিবার। ফলে এই পুজোয় শতাব্দীপ্রাচীন কাল থেকেই কোনো রকম বলিপ্রথার প্রচলন নেই। মহাসপ্তমী থেকে মহা নবমী পর্যন্ত সম্পূর্ণ নিয়মনিষ্ঠা মেনে নিরামিষ আহার ও ভোগ নিবেদন চলে। মহাষ্টমীর রাতে ১০৮টি প্রদীপের আলোয় ঝলমলে হয়ে ওঠে পুরো উঠোন। এর পাশাপাশি মহাসমারোহে অনুষ্ঠিত হয় কুমারীপুজো ও সন্ধিপুজো। শতবর্ষের প্রথা মেনেই পুজোর ক’দিন দেবীর বিশেষ প্রসাদে ঠাঁই পায় গরম লুচি, রকমারি ভাজাভুজি, সুস্বাদু নাড়ু, ফল এবং ক্ষীর।
দশমীর রাত ও ঐতিহ্যবাহী ‘মেটে চচ্চড়ি’
বিজয়া দশমীর বিসর্জনের আনুষ্ঠানিক পর্ব শেষ হওয়ার পরই কেবল পরিবারে আমিষ রান্নার অনুমতি মেলে। আর সেই বিশেষ রাতের গ্র্যান্ড ভোজের মূল কেন্দ্রবিন্দু ও প্রধান আকর্ষণ হলো বহুকালের ঐতিহ্যবাহী স্পেশাল পদ—‘মেটে চচ্চড়ি’। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রজন্ম বদলালেও, দশমীর রাতের এই বিশেষ পদের স্বাদ ও আবেগ আজও মল্লিক পরিবারের পুজোর আবহকে একইরকম সজীব ও অটুট রেখেছে।
কর্মসূত্রে পৃথিবীর যে প্রান্তেই বা কোণে যিনি থাকুন না কেন, দুর্গাপুজোর এই চার-পাঁচটা দিন পরিবারের সমস্ত সদস্য সমস্ত ব্যস্ততা ভুলে একসঙ্গে হাজির হন এই ভবানীপুরের মল্লিক বাড়িতে। আর ব্যস্ততার চাদর সরিয়ে অভিনেত্রী কোয়েল মল্লিকও পুরোদস্তুর এক্কেবারে ‘ঘরের মেয়ে’ হয়ে কুমারীপুজো থেকে শুরু করে অতিথি আপ্যায়ন—সব দায়িত্ব নিখুঁতভাবে সামলান নিজের হাতেই।