২৭ বছর পর কি আকাশে ফিরবে আমেরিকার সেই বিধ্বংসী ব্ল্যাকবার্ড? নাসার পদক্ষেপে তুঙ্গে জল্পনা

মার্কিন বিমান বাহিনীর ইতিহাসের অন্যতম বিখ্যাত এবং রহস্যময় গুপ্তচর বিমান এসআর-৭১ ব্ল্যাকবার্ড (SR-71 Blackbird) কি সত্যিই আবার আকাশে ফিরতে চলেছে? দীর্ঘ ২৭ বছর আগে ১৯৯৯ সালে এই বিমানটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবসরে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু সম্প্রতি নাসার একটি বিশেষ পদক্ষেপে এই বিমানটির প্রত্যাবর্তন নিয়ে বিশ্বজুড়ে নতুন করে গুঞ্জন শুরু হয়েছে। তবে বিষয়টি শুনতে যতটা রোমাঞ্চকর, বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এর পথ ততটাই কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং।

কেন হঠাৎ আলোচনায় উঠে এল ব্ল্যাকবার্ড?

ক্যালিফোর্নিয়ায় নাসার আর্মস্ট্রং ফ্লাইট রিসার্চ সেন্টারের বাইরে এতদিন যে বিমানটি প্রদর্শনী বা ডিসপ্লেতে রাখা ছিল, হঠাৎ করেই সেটিকে সেখান থেকে সরিয়ে হ্যাঙ্গারে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি নাসার শীর্ষকর্তাদের কিছু মন্তব্য এই জল্পনাকে আরও উসকে দিয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, বিমানটিকে পরীক্ষা করে হয়তো নতুন করে উড়ানোর কোনো পরিকল্পনা চলছে। যদিও মহাকাশ গবেষণা সংস্থার পক্ষ থেকে এখনও এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়নি।

ব্ল্যাকবার্ড কেন এত বিশেষ ছিল?

লকহিড কোম্পানির তৈরি এই বিমানটি প্রথম উড্ডয়ন করেছিল ১৯৬৪ সালে। এর প্রধান কাজ ছিল শত্রুর চোখ ফাঁকি দিয়ে অত্যন্ত উঁচুতে এবং অবিশ্বাস্য গতিতে উড়ে গোপন গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করা। এটি প্রচলিত যুদ্ধবিমানের মতো সরাসরি আক্রমণ করার জন্য তৈরি করা হয়নি, বরং সঠিক তথ্য সংগ্রহ করে নিরাপদে ফিরে আসাই ছিল এর মূল উদ্দেশ্য। প্রায় সাড়ে তিন হাজার কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টার বেশি গতি এবং ৮৫ হাজার ফুট উঁচুতে ওড়ার রেকর্ড গড়েছিল এই বিমানটি। তবে অত্যধিক রক্ষণাবেক্ষণ খরচ এবং উপগ্রহ বা ড্রোনের মতো আধুনিক প্রযুক্তির সহজলভ্যতার কারণে ১৯৯৯ সালের ৯ অক্টোবর এটিকে স্থায়ীভাবে বসিয়ে দেওয়া হয়।

ফিরে আসতে গেলে যেসব বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে

একটি বিমান দীর্ঘ ২৭ বছর ধরে বাইরে নিষ্ক্রিয় থাকার পর হুট করে আকাশে উড়ে যেতে পারে না। এর পেছনে রয়েছে বেশ কিছু বড় প্রযুক্তিগত ও ব্যবহারিক সমস্যা:

  • পুরোনো কাঠামো ও জং: দীর্ঘ সময় ধরে আবহাওয়া পরিবর্তনের মধ্যে বাইরে থাকার কারণে বিমানটির ধাতব কাঠামো, ইঞ্জিন, তার এবং পাইপলাইনে ধুলোবালি বা ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। নিখুঁত পরীক্ষা ছাড়া এটিকে আকাশে তোলার ঝুঁকি নেওয়া অসম্ভব।

  • জ্বালানির সংকট: ব্ল্যাকবার্ড চালানোর জন্য সাধারণ এভিয়েশন ফুয়েল কাজ করে না। এর জন্য ‘জেপি-৭’ (JP-7) নামের এক বিশেষ জ্বালানি এবং ইঞ্জিন চালুর জন্য বিশেষ রাসায়নিকের প্রয়োজন হয়, যার নিয়মিত জোগান বর্তমানে সহজলভ্য নয়।

  • খুচরা যন্ত্রাংশের অভাব: বহু বছর আগে এই মডেলের অনেক অতিরিক্ত যন্ত্রাংশ ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল। ফলে বর্তমানের প্রয়োজন মেটাতে নতুন করে যন্ত্রাংশ তৈরি করতে হবে যা অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ।

  • প্রশিক্ষণ ও সুরক্ষা: এই বিশেষ বিমান পরিচালনা করার জন্য অত্যন্ত দক্ষ পাইলট এবং প্রকৌশলী দল প্রয়োজন, যাদের বর্তমান প্রজন্মে এই বিমান ওড়ানোর সরাসরি অভিজ্ঞতা নেই।

এসআর-৭১ ব্ল্যাকবার্ডকে আবার সচল করার চিন্তাটি শুনতে দারুণ লাগলেও, এর ব্যবহারিক পথটি বেশ দীর্ঘ এবং জটিল। কেবল হ্যাঙ্গার থেকে বিমানটি বাইরে এনে দাঁড়া করলেই কাজ শেষ হয় না। এর পেছনে প্রয়োজন কোটি কোটি টাকার বিনিয়োগ, কঠোর প্রযুক্তিগত পরীক্ষা এবং দীর্ঘ সময়। তাই এটি সত্যিই আকাশে ফিরবে কি না, তা নিশ্চিতভাবে জানতে সংস্থার অফিসিয়াল বিবৃতির জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *