এক ধাক্কায় ২৬ ডলার বাড়ল তেলের দাম! ভারতীয় অর্থনীতির সামনে নতুন কোন বিপদের আশঙ্কা?

ভারতের অর্থনীতি বেশ শক্তিশালী গতিতে এগিয়ে চললেও আন্তর্জাতিক বাজারের নতুন কিছু চাপ ও অনিশ্চয়তা কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। বিশেষ করে অপরিশোধিত তেলের দামের লাগামছাড়া ঊর্ধ্বগতি এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক নিয়ে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তা ভারতের অর্থনীতির সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রকের প্রকাশিত মাসিক অর্থনৈতিক পর্যালোচনা প্রতিবেদনে এই বিষয়গুলিকে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এক মাসে প্রায় ২৯ শতাংশ বাড়ল তেলের দাম
প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ভারতীয় অপরিশোধিত তেলের ঝুড়ির গড় দাম সেপ্টেম্বরে হু হু করে বেড়ে প্রতি ব্যারেল ১১৬.০৪ ডলারে (ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ১১,১৩৮ টাকা) পৌঁছেছে। যেখানে আগস্ট মাসে এই দাম ছিল ৯০.১৯ ডলার বা প্রায় ৮,৬৫৭ টাকা। অর্থাৎ, এক মাসের ব্যবধানে প্রতি ব্যারেলে দাম বেড়েছে ২৫.৮৫ ডলার বা প্রায় ২,৪৮১ টাকা, যা শতাংশের বিচারে প্রায় ২৮.৬৬ শতাংশ বেশি। এছাড়া গত ২৯ সেপ্টেম্বর ভারতীয় অপরিশোধিত তেলের দাম ছিল ১১৬.৫২ ডলার (প্রায় ১১,১৮৪ টাকা)।
ভারত তার জ্বালানি চাহিদার বড় অংশই বিদেশ থেকে আমদানি করে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দীর্ঘদিন চড়া থাকলে দেশের আমদানি খরচ হু হু করে বাড়বে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে পরিবহণ খরচ, পণ্য সরবরাহ, উৎপাদন এবং সামগ্রিক ব্যবসায়িক খরচের ওপর।
মূল্যবৃদ্ধির চাপ ও দেশের শক্তিশালী অর্থনীতি
অর্থ মন্ত্রকের পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক তেলের বাজারের এই চাপ এবং আবহাওয়াজনিত নানা অস্থিরতার কারণে খুচরো, পাইকারি ও উৎপাদক—তিন স্তরেই মূল্যবৃদ্ধির চাপ কিছুটা বেড়েছে। তবে স্বস্তির বিষয় হলো, সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি এখনও সরকারের নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই রয়েছে।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের প্রথম ত্রৈমাসিকে ভারতের প্রকৃত জিডিপির (GDP) বৃদ্ধির হার ছিল শক্তিশালী ৭.৮ শতাংশ। একই সময়ে শিল্প ক্ষেত্রে প্রকৃত গ্রস ভ্যালু অ্যাডেড (GVA) বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ৭.৭ শতাংশ এবং কেবল উৎপাদন শিল্পেই বৃদ্ধির হার ছিল ৯.২ শতাংশ। পাশাপাশি, আর্থিক পরিষেবা, আবাসন, তথ্যপ্রযুক্তি এবং পেশাদারি পরিষেবা খাতে অসাধারণ পারফরম্যান্সের সুবাদে এই ক্ষেত্রে বৃদ্ধির হার ছুঁয়েছে ১২.১ শতাংশ।
আমেরিকার বাণিজ্য নীতি ও এফডিআই (FDI) পরিস্থিতি
তৈল বাজারের অস্থিরতার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গতিপ্রকৃতিও ভারতের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জের জন্ম দিচ্ছে। বিশেষ করে, যে সমস্ত দেশ রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেল কেনে, তাদের ওপর আমেরিকার সম্ভাব্য উচ্চ শুল্ক আরোপের বিষয়টি বাজারে বড় ধরণের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। অর্থ মন্ত্রকের মতে, বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে সরবরাহ শৃঙ্খল বা সাপ্লাই চেইনকে অর্থনৈতিক নীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। একইসঙ্গে উন্নত দেশগুলোর মধ্যে নতুন উৎপাদন প্রকল্পে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের প্রতিযোগিতাও তীব্র হয়েছে।
তবে এই সমস্ত প্রতিকূলতার মধ্যেও ভারতের জন্য একটি অত্যন্ত ইতিবাচক দিক হলো নিট প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ বা এফডিআই (FDI)। অর্থ মন্ত্রকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষে নিট এফডিআই আগের বছরের তুলনায় অনেকটাই বাড়তে পারে। ফলে দেশের অভ্যন্তরীণ শক্তিশালী চাহিদা ও বিনিয়োগের পাশাপাশি এই বিদেশি মূলধনের প্রবাহ ভারতের অর্থনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।