মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব আনছে ইন্ডিয়া জোট! দিল্লিতে মেগা বৈঠকে কোন বড় ঝড় উঠতে চলেছে?

ভোটার তালিকা সংশোধন তথা এসআইআর (SIR) প্রক্রিয়ায় ব্যাপক কারচুপি এবং নির্বাচন কমিশনের (ECI) নিরপেক্ষতা নিয়ে দেশজুড়ে ওঠা তীব্র বিতর্কের মাঝেই বুধবার দিল্লির রাজনৈতিক অঙ্গনে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বসলেন বিরোধী ‘ইন্ডি’ (INDIA) জোটের শীর্ষ নেতারা। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (CEC) জ্ঞানেশ কুমারকে সরাসরি নিশানা করে সংসদের অন্দরে তাঁর বিরুদ্ধে ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব আনা এবং দেশজুড়ে একযোগে মেগা আন্দোলনের চূড়ান্ত রূপরেখা তৈরি করাই এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের মূল এজেন্ডা ছিল।
কারা উপস্থিত ছিলেন এই বৈঠকে?
দিল্লির এই মেগা বৈঠকে বিরোধী শিবিরের হেভিওয়েট নেতাদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে, সোনিয়া গান্ধী ও রাহুল গান্ধীর পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিনিধিত্ব করতে উপস্থিত ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। এছাড়া বৈঠকে যোগ দিয়েছিলেন তেজস্বী যাদব (আরজেডি), ওমর আবদুল্লা (জেকেএনসি), মেহবুবা মুফতি (পিডিপি), হেমন্ত সোরেন (জেএমএম), উদ্ধব ঠাকরে (শিবসেনা-ইউবিটি), সুপ্রিয়া সুলে (এনসিপি-এসপি), এম এ বেবি (সিপিআইএম) এবং বর্ষীয়ান সাংসদ কপিল সিব্বলের মতো জাতীয় নেতারা। তবে সমাজবাদী পার্টি প্রধান অখিলেশ যাদব উত্তরপ্রদেশের রাজ্যসভা নির্বাচন সংক্রান্ত ব্যস্ততার কারণে সশরীরে উপস্থিত থাকতে না পারলেও, নিজের প্রতিনিধি হিসেবে দলের দুই সাংসদ হরেন্দ্র মালিক ও মৌলানা মহিবুল্লাহ নদভিকে পাঠিয়েছেন।
বিরোধীদের পাঁচ দফা জোরালো দাবি
কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির (CWC) সাম্প্রতিক প্রস্তাবের ঠিক পরেই এই জরুরি বৈঠকের ডাক দেওয়া হয়। বৈঠকে সোচ্চার হয়ে কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে অভিযোগ করেন যে, বিগত বারো বছর ধরে বর্তমান বিজেপি সরকার দেশের মূল গণতান্ত্রিক ভিত্তিকে সুপরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করে চলেছে এবং নির্বাচন কমিশনকে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করছে।
কেন্দ্রীয় সরকারের এই নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করতে বিরোধী জোট মূলত পাঁচটি প্রধান দাবি সামনে রেখে দেশজুড়ে আন্দোলনে নামার সিদ্ধান্ত নিয়েছে:
১. ভোটার তালিকার ডেটা প্রকাশ: ভোটার তালিকা থেকে যাবতীয় নাম সংযোজন ও ছাঁটাইয়ের সম্পূর্ণ ডেটা জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে।
২. আপিলের সুযোগ: যাঁদের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, তাঁদের প্রত্যেককে আইনি পুনর্বিবেচনা বা আপিল করার সুনির্দিষ্ট সুযোগ দিতে হবে।
৩. সহজ ফর্ম্যাটে তালিকা: সমস্ত স্বীকৃত রাজনৈতিক দলকে যথাসময়ে এবং পঠনযোগ্য সহজ ফর্ম্যাটে সংশোধিত ভোটার তালিকা হস্তান্তর করতে হবে।
৪. স্বাধীন তদন্ত: যে সমস্ত বিধানসভা বা লোকসভা কেন্দ্রে বড় মাপের অসঙ্গতি ধরা পড়েছে, সেখানে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে।
৫. স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি: নির্বাচন কমিশনকে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় কাজ করতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষের মনে কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে কোনো সংশয় না থাকে।
কমিশন ও কেন্দ্রের প্রতিক্রিয়া
অন্যদিকে, কেন্দ্র সরকার এবং নির্বাচন কমিশন বিরোধীদের সমস্ত অভিযোগ একবাক্যে খারিজ করে দিয়েছে। কমিশনের সাফ দাবি, ভোটার তালিকা থেকে ভুয়ো, মৃত বা ঠিকানা পরিবর্তন করা ভোটারদের নাম বাদ দিয়ে একটি নির্ভুল ও স্বচ্ছ তালিকা প্রস্তুত করাই এসআইআর প্রক্রিয়ার মূল লক্ষ্য। এটিকে সম্পূর্ণভাবে একটি আইনি ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়া হিসেবে বর্ণনা করে কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, রাজনৈতিক ফায়দা তুলতেই এই বিষয়টিকে নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে।
তবে কমিশনের এই সাফাই মানতে নারাজ বিরোধীরা। নিজেদের দাবিতে সম্পূর্ণ অনড় থেকে সংসদের ভিতর এবং বাইরে সরকারের বিরুদ্ধে একযোগে তীব্র রাজনৈতিক লড়াইয়ের স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়ে রাখল ইন্ডিয়া জোট।