ট্র্যাকে নেই কোনো প্রতিপক্ষ! এশিয়ান গেমসে একাই দৌড়ে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিল দক্ষিণ কোরিয়া, কেন এমন ঘটনা?

অ্যাথলেটিক্সের ট্র্যাকে এমন দৃশ্য সচরাচর দেখা যায় না। সামনে নেই কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী, নেই অন্য কোনো দলও। বৃষ্টিভেজা ট্র্যাকে রিলে রেসে কেবল একই দলের চার অ্যাথলিট একাই ছুটে চলেছেন—চারপাশ সম্পূর্ণ ফাঁকা। চলতি এশিয়ান গেমসে মিক্সড ৪x১০০ মিটার রিলে ইভেন্টে এমনই এক বিরল ও অবিশ্বাস্য দৃশ্যের সাক্ষী থাকল নাগোয়ার মিজুহো পার্ক অ্যাথলেটিক স্টেডিয়াম। মূলত বাইরে থেকে তৈরি হওয়া বাধার কারণে প্রথমবার দৌড় শেষ করতে না পারায়, দক্ষিণ কোরিয়ার দলকে একাই ফের দৌড়ানোর সুযোগ দেন বিচারকরা।

ঘটনার সূত্রপাত যেভাবে:
ঘটনার সূত্রপাত মিক্সড ৪x১০০ মিটার রিলের দ্বিতীয় হিটে। বৃষ্টির মধ্যে তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাঝে দৌড় চলাকালীন দক্ষিণ কোরিয়ার রিলে দল আচমকাই ট্র্যাকে বড় ধরনের বাধার মুখে পড়ে। যার জেরে স্বাভাবিকভাবে নিজেদের দৌড় শেষ করতে পারেননি কোরিয়ার অ্যাথলিটরা। ফলে তাঁদের নামের পাশে অফিশিয়ালি ‘ডিড নট ফিনিশ’ বা DNF লেখা হয়।

তবে এই সিদ্ধান্ত সহজে মেনে নেয়নি দক্ষিণ কোরিয়ার দল। কোচিংসেরা সঙ্গে সঙ্গে এর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানান এবং ঘটনার ভিডিও ফুটেজ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখার আবেদন করেন। এরপর আয়োজকরা ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনা করে দেখতে পান, কোরিয়ার অ্যাথলিটদের নিজেদের কোনো ভুল ছিল না; বরং বাহ্যিক বাধার কারণেই তাঁদের দৌড় সম্পূর্ণ পণ্ড হয়েছিল।

আয়োজকদের অভিনব সিদ্ধান্ত:
অ্যাথলেটিক্সের আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী, কোনো অ্যাথলিট বা দল যদি প্রতিপক্ষের বাধা, ফাউল কিংবা অন্য কোনো অনভিপ্রেত বাহ্যিক কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হন, তবে বিশেষ পরিস্থিতি বিবেচনা করে তাঁদের পুনরায় দৌড়ানোর সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। সেই নিয়মের ওপর ভিত্তি করেই দক্ষিণ কোরিয়াকে সম্পূর্ণ এককভাবে ফের ৪x১০০ মিটার রিলে দৌড়ানোর অনুমতি দেয় আয়োজক কমিটি।

ফাঁকা ট্র্যাকে চার স্প্রিন্টারের দৌড়:
স্টেডিয়ামে তখন অন্য কোনো দল বা প্রতিযোগী ছিল না। স্কোরবোর্ডে ‘Mixed 4x100m Relay Rerun 1’ ব্যানারে সম্পূর্ণ ফাঁকা ট্র্যাকে নামে দক্ষিণ কোরিয়ার চার অ্যাথলিটের দল। বৃষ্টিতে ভেজা ট্র্যাকে উপস্থিত দর্শকদের সামনে শুরু হয় তাঁদের সেই একক মহড়া। অদ্ভুত ও নজিরবিহীন সেই দৃশ্য মুহূর্তেই নজর কাড়ে স্টেডিয়ামের দর্শক থেকে শুরু করে সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহারকারীদেরও।

অবশ্য এই বিশেষ সুযোগ পেয়েও শেষরক্ষা হয়নি। ফাইনালে ষষ্ঠ স্থানে শেষ করে দক্ষিণ কোরিয়া রিলে দল। এই ইভেন্টে সোনা জেতে বাহারিন এবং দারুণ পারফরম্যান্স করে রুপো জেতে ভারতের রিলে দল।

উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক অ্যাথলেটিক্সের ইতিহাসে ঠিক এমন ঘটনা একেবারে প্রথম নয়। এর আগে ২০১৬ সালের রিও অলিম্পিক্সেও একই ধরনের ঘটনার সাক্ষী থেকেছিল বিশ্ব। সেবার মহিলাদের ৪x১০০ মিটার রিলেতে অনভিপ্রেত বাধার মুখে পড়ে আমেরিকার দল এবং পরবর্তীতে তাঁদেরও একা দৌড়ানোর সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। সেই ঐতিহাসিক দৌড়ের পরই ফাইনালে জায়গা করে নিয়ে সোনা জিতেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

নাগোয়ার এই ঘটনায় তাই নতুন করে সামনে এসেছে ‘ফেয়ার প্লে’ বা সুস্থ প্রতিযোগিতার প্রশ্নটি। প্রতিযোগিতার পদক বা ফলের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে এই সত্য যে, কোনো অ্যাথলিট যেন অন্যের ভুল বা অনিচ্ছাকৃত বাধার কারণে তার প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত না হন। এশিয়ান গেমসের মঞ্চে অন্য প্রতিযোগীদের ছাড়াই একটি পুরো রিলে দলের একা দৌড়ানোর এই ঘটনা নিঃসন্দেহে এবারের এশিয়াডের অ্যাথলেটিক্সের অন্যতম সেরা ও আলোচিত মুহূর্ত হয়ে রইল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *