৫০ টাকার চাকরি থেকে কোটি টাকার সাম্রাজ্য! কাটোয়ার যুবকের অভাব জয়ের অবিশ্বাস্য গল্পে চোখ কপালে তুলবে সবার

জীবন সংগ্রামের গল্প অনেক শোনা যায়, কিন্তু কিছু গল্প সত্যি রূপকথার মতো অনুপ্রেরণা জোগায়। মাত্র ৫০ টাকা বেতনের চাকরি দিয়ে কেরিয়ার শুরু করে আজ কুড়িটি তরতাজা প্রাণের কর্মসংস্থানের পথ তৈরি করেছেন পূর্ব বর্ধমানের কাটোয়া শহরের বাসিন্দা রিপন দেবনাথ। চরম আর্থিক অনটন, পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং পদে পদে ধাক্কা খাওয়ার পরেও জেদ আর পরিশ্রমের জোরে নিজের ভাগ্য নিজেই গড়ে তুলেছেন এই তরুণ উদ্যোক্তা।
একসময় কাজের সন্ধানে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ঘুরে বেড়াতে হতো রিপনকে। কখনও ইমিটেশনের দোকান, কখনও আবার কম্পিউটার সেন্টারে বেয়ারার কাজ— পেটের টানে সব ধরনের কাজ করতে হয়েছে তাঁকে। সিকিউরিটি গার্ডের দায়িত্ব সামলানোর পাশাপাশি ফ্লেক্সের দোকানে মাত্র তিন হাজার টাকা বেতনের বিনিময়ে গ্রাফিক্সের কাজ শিখেছিলেন তিনি। ছোট থেকেই কম্পিউটারের প্রতি তীব্র আকর্ষণ থাকলেও অর্থের অভাবে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেওয়ার কোনো উপায় ছিল না। তাই কম্পিউটার সেন্টারে বেয়ারার কাজ নিয়েছিলেন শুধু ফাঁকে ফাঁকে শেখার সুযোগ পাওয়ার লোভে। সেই সেন্টারে চা জল দেওয়া থেকে শুরু করে যাবতীয় টুকিটাকি কাজ করতেন তিনি।
পরিবারের আর্থিক পরিস্থিতির চাপে উচ্চ মাধ্যমিকের পরেই ইতি টানতে হয়েছিল প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনায়। তবে শেখার স্পৃহা তাঁকে থামিয়ে রাখতে পারেনি। কলকাতার গেঞ্জি তৈরির কারখানায় দাদাদের কাজের অভিজ্ঞতা থেকে নিজের মাথায় আসে কাপড়ের উপর অভিনব ডিজাইন ফুটিয়ে তোলার আইডিয়া। ওয়েবসাইট তৈরির মতো পর্যাপ্ত টাকা হাতে না থাকায় কিস্তিতে একটি কম্পিউটার কিনে ফেলেন তিনি। নিজেই ইন্টারনেট ঘেঁটে ওয়েবসাইট তৈরি শিখে গড়ে তোলেন নিজস্ব টি-শার্টের ব্র্যান্ড।
আজ তাঁর সেই উদ্যোগের পোশাক দেশের গণ্ডি পেরিয়ে পৌঁছে যাচ্ছে বিদেশেও। পোশাক ব্যবসার পাশাপাশি তিনি সফলভাবে পরিচালনা করছেন একটি ডিজিটাল মার্কেটিং সংস্থা এবং পডকাস্ট চ্যানেল। তাঁর এই পডকাস্টের মূল উদ্দেশ্যই হলো গ্রামের সাধারণ ও প্রতিভাবান মানুষদের নিজেদের কথা তুলে ধরার একটি স্বাধীন প্ল্যাটফর্ম দেওয়া। বর্তমানে তাঁর সংস্থায় প্রায় কুড়িজন তরুণ-তরুণী কাজ করছেন। একসময় যিনি সামান্য বেতনে কাজ করতেন, আজ তিনি তাঁর কর্মচারীদের তার চেয়ে বহুগুণ বেশি বেতন দিচ্ছেন।
এই দীর্ঘ ও বন্ধুর পথচলায় পরিবারের পাশাপাশি তাঁর স্ত্রী ও পরীক্ষিত টিম মেম্বারদের অবদানকে সবসময় সামনে রাখেন রিপন। এমন দিনও গেছে যখন কর্মচারীদের হাতে সময়মতো বেতন তুলে দেওয়ার মতো সামর্থ্য ছিল না, তবুও সেই কর্মীরা কঠিন সময়ে তাঁর পাশ থেকে সরে যাননি। শূন্য থেকে শুরু করে আজ বড় পরিসরে ব্যবসা পরিচালনা করতে সম্প্রতি কলকাতায় নতুন অফিসও চালু করেছেন তিনি। রিপনের এই সফল যাত্রা প্রমাণ করে যে, প্রতিকূল পরিস্থিতি যতই কঠিন হোক না কেন, প্রবল ইচ্ছেশক্তি এবং কঠোর পরিশ্রম থাকলে নিজের ভাগ্য বদলানো সময়ের অপেক্ষা মাত্র।